Saturday, 18 October 2025

Thursday, 16 October 2025

Literary Blog of Bijaya Deb


মাইকেল মধুসূদন দত্তের চতুর্দশপদী কবিতাবলি : কিছু তথ্য কিছু কথা।


“I want to introduce the Sonnet into our language and, some morning ago, made the following- 
“ কবি মাতৃভাষা’'

নিজাগারে ছিল মোর অমূল্য রতন 
অগণ্য; তা সবে আমি অবহেলা করি,
অর্থলোভে দেশে দেশে করিনু ভ্রমণ, 
বন্দরে বন্দরে যথা বাণিজ্যের তরী।
কাটাইনু কতকাল সুখ পরিহরি,
এই ব্রতে,যথা তপোবনে তপোধন, 
অশন,শয়ন ত্যজে, ইষ্টদেবে স্মরি, 
তাঁহার সেবায় সদা সঁপি কায় মন।
বঙ্গকুল-লক্ষ্মী মোরে নিশার স্বপনে 
কহিলা - হে বৎস, দেখি তোমার ভকতি,
সুপ্রসন্ন তব প্রতি দেবী সরস্বতী।
নিজ গৃহে ধন তব, তবে কি কারণে 
ভিখারি তুমি হে আজি, কহ ধনপতি?
কেন নিরানন্দ তুমি আনন্দ সদনে?  
What say you to this my friend! In my humble opinion, if cultivated by men of genius, our Sonnet in time would rival the Italian.’’ 
এই পত্রটি লিখেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে খুব সম্ভবত ১৮৬০ ইংরাজিতে। 
১৮৬২ সালে ক্যান্ডিয়া জাহাজে করে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ফ্রান্সে যাত্রা করেন। এই সময়কালে তিনি ইতালিয়ান ভাষাচর্চা শুরু করেন এবং মূলভাষায় ইতালিয়ান কবি তাসোর (Tasso) কাব্য পাঠ করেন। পাঠ করেন ইতালিয় কবি পেত্রার্কার সনেট( Francesco di Petracco)। আমরা জানি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলাসাহিত্যের বাঁক বদল করেন। তাঁর প্রতিটি কাব্য নাটক প্রহসন মহাকাব্যে পাশ্চাত্যের প্রভাব রয়েছে এবং বলতেই হয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে পূর্বজের প্রভাব সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের স্রোতধারায় রয়েছে। পূর্বজকে সামনে রেখে নতুন কিছুর প্রণয়ন সাহিত্যের ধর্ম। মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যের স্রোতধারার শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায় তখন মাইকেল মধুসূদন দত্তের সামনে রয়েছেন। ভারতচন্দ্র রায় মঙ্গলকাব্যে করেছেন আধুনিকতার সঞ্চার অজস্র নতুন শব্দ সৃষ্টি করে। বলা ভালো, একধরনের রাজকীয় ঐশ্বর্য এনেছেন মঙ্গলকাব্যে। এদিকে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ভেতরে জন্ম নিয়েছে মাতৃভাষার প্রতি আসক্তি। তিনি বুঝতে পেরেছেন বাংলা ভাষার মতো গরীয়সী ভাষায় সাহিত্যের দিকবদল করার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। তখন তিনি রয়েছেন ফ্রান্সের ভার্সাই ( Versailles) নগরীতে। সেখান তিনি চারটি পেত্রার্কীয় ধাঁচে কবিতা লিখে পাঠালেন তাঁর বন্ধু গৌরদাস বসাককে -
“  You again date your letter from “Bagirhat”. Is this “ Bagirhat'’ on the bank of my own native river? I have been reading Petrarca - the Italian poet, and scribbling some” sonnets” after his manner. There is one addressed to this very river “কবতক্ষ”। I send you this and another -the later has been very much liked by several European friends of mine to whom I have been translated it. I dare say, you will like it too. Pray, get these sonnets copied and sent to Jatindralal and Rajnarain and let me know what they think of them. I dare say, you would the sonnet “চতুর্দশপদী’' will do wonderfully well in our language. I hope to come out with a small volume one of these days. I add a third; I flatter myself that since the day of his death  ভারতচন্দ্র রায় never such an elegant compliment paid to him.There's variety for you,my friend. I should wish you to show these things to Rajendra also,for he is a good judge. Write to me what you all think of this new style of Poetry. Believe me, my dear fellow, our Bengali is a very beautiful language, it only wants men of genius to polish it up.”     
যে চারটি সনেট মাইকেল মধুসূদন দত্ত বন্ধুবর্গকে পাঠিয়ে ছিলেন সেই চারটি সনেট ছিল “অন্নপূর্ণার ঝাঁপি”, “জয়দেব”, “সায়ংকাল’', “কপোতাক্ষ নদ”। পত্রটিতে যে  বন্ধুবর্গের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন তাঁরা হলেন যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, রাজনারায়ণ রায় এবং গৌরদাস বসাক। এই চারটি সনেটের প্রতিটিই যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের ভালো লেগেছিল। তবে তাঁর বিশেষভাবে ভালো লেগেছিল “ জয়দেব” ও “সায়ংকাল’'। তিনি চারটি সনেটই রাজেন্দ্রলাল মিত্র সম্পাদিত “ রহস্য সন্দর্ভে” প্রকাশের জন্যে তিনি  পাঠিয়ে দেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র সম্পাদিত “রহস্য সন্দর্ভ’' পত্রিকায় এর থেকে দু’টি কবিতা প্রকাশিত হয়, “কপোতাক্ষ নদ” ও “সায়ংকাল’'। ভূমিকায় রাজেন্দ্রলাল মিত্র লিখেছিলেন - 
“নিম্নস্থ চতুর্দশপদী কবিতাদ্বয় মাইকেল মধুসূদন দত্ত কর্তৃক প্রণীত।উক্ত মহোদয়ের ‘শর্মিষ্ঠা’’, ‘তিলোত্তমা’
মেঘনাদাদি কাব্য বঙ্গভাষার উৎকৃষ্ট বলিয়া প্রসিদ্ধ আছে। মেঘনাদ বাঙালী মহাকাব্য বলিবার উপযুক্ত।… তাঁহা কর্তৃক বঙ্গভাষায় অমিত্রাক্ষর কবিতার সৃষ্টি হইয়াছে বলিয়াও এতদ্দেশীয়দের মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত আছেন।….. ‘'
ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে বসেই খুব কম সময়ের মধ্যে মধুসূদন একশোরও বেশি সনেট রচনা করেন। তিনি কবিতাবলীর নাম দেন চতুর্দশপদী কবিতাবলী এবং পান্ডুলিপি তৈরি করে তাঁর প্রকাশকের কাছে পাঠিয়ে দেন। তাঁর প্রকাশক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বসু। ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন কলকাতার স্ট্যানহোপ প্রেসের স্বত্বাধিকারী। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১লা আগস্ট “চতুর্দশপদী কবিতাবলী’' পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। 
গোটা মধ্যযুগ ধরে বাংলাসাহিত্যের পথচলার যে রীতি ছিল তাঁর একঘেয়েমি তাঁকে ক্লান্ত করেছিল। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়ের অন্নদামঙ্গল কাব্যে যে নতুনত্ব সঞ্চার হয়েছিল মধুসূদন তাঁকে সঠিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন এবং হয়তো বা ভারতচন্দ্রের সেই  নতুনত্ব সঞ্চারের প্রয়াস থেকেই বাংলা সাহিত্যের দিকবদল করার কথা ভেবেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। উপরের চিঠিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি কবি লিখছেন -”I flatter myself that since the day of his death ভারতচন্দ্র রায় never such an elegent compliment paid to him.” ( আমি আত্মপ্রশংসাই করছি, কারণ ভারতচন্দ্র রায় মৃত্যুর পর থেকে আজ পর্যন্ত এমন প্রশংসাবাদ পাননি।) প্রসঙ্গত, মধুসূদন লিখছেন তিনি “কপোতাক্ষ নদ’' ( পত্রতে কবতক্ষ নদ) সনেটটি অনুবাদ করে ইউরোপের কয়েকজন সাহিত্য বন্ধুকে পড়িয়েছিলেন এবং তাঁরা উচ্চপ্রশংসা করেছিলেন। সুতরাং বাংলাসাহিত্যের বাঁকবদলের ভাবনার সূত্র শুধু যে পাশ্চাত্যপ্রভাবাপন্ন  ছিল, তা হয়তো নয়। ভারতচন্দ্র প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে নতুনত্ব এনেছেন অজস্র আরবি ফার্সি শব্দপ্রয়োগে, নতুন সব প্রবাদ প্রবচন ব্যবহার করে মঙ্গলকাব্যে রাজকীয় সৌন্দর্য এনে, আর মধুসূদন প্রচলিত ধারা থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে এসে পাশ্চাত্য ধারার সাথে দেশীয় ধারার সংমিশ্রণে এক ব্যতিক্রমী সাহিত্যধারার জন্ম দিলেন। 
যে চারটি সনেট  তিনি গৌরদাস বসাককে পাঠিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি হলো “অন্নপূর্ণার ঝাঁপি ‘'। এবং সেই সনেটটিতে আমরা অন্নদামঙ্গলের ভবানন্দ মজুমদারকে দেখতে পাই, দেখতে পাই সম্পদের ঝাঁপি হাতে দেবী অন্নপূর্ণাকে। 
পেত্রার্কীয় সনেট রীতি আমরা জানি। চৌদ্দ অক্ষর ও চৌদ্দ পংক্তি বিশিষ্ট কবিতা। এই রীতির সনেটকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়।  প্রথম আট পংক্তি বিশিষ্ট অংশটিকে অষ্টক ( Octave)  আর পরের ছয় পংক্তিবিশিষ্ট অংশটিকে বলা হয় ষটক ( Sestet)। প্রথম আট পংক্তিতে আসে কবির উপস্থাপনা আর পরের ছয় পংক্তিতে আসে কবির উপলব্ধি, সেটি ব্যক্তিগত অনুভব। “অন্নপূর্ণার ঝাঁপি” সনেটটি এখানে দিচ্ছি - 
  অন্নপূর্ণার ঝাঁপি 

মোহিনী রূপসী বেশে ঝাঁপি কাঁখে করি
পশিছেন ভবানন্দ, দেখ তব ঘরে
অন্নদা! বহিছে শূন্যে সঙ্গীত লহরী, 
অদৃশ্যে অপ্সরাচয় নাচিছে অম্বরে।
দেবীর প্রসাদে তোমা রাজপদে বরি,
রাজাসন, রাজছত্র, দিবেন সত্বরে
রাজলক্ষ্মী ; ধন- স্রোতে তব ভাগ্যতরী
ভাসিবে অনেকদিন, জননীর বরে।
কিন্তু চিরস্থায়ী অর্থ নহে এ সংসারে ;
চঞ্চলা ধনদা রমা, ধনও চঞ্চল ;
তবু কি সংশয় তব, জিজ্ঞাসি তোমারে?
তব বংশ- যশ: - ঝাঁপি অন্নদামঙ্গল-
যতনে রাখিবে বঙ্গ মনের ভান্ডারে, 
রাতে যথা সুধামৃতে চন্দ্রের মন্ডলে।। 

ভবানন্দ মজুমদার নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষ। তিনিই নবদ্বীপে রাজবংশের সূচনা করেন বলে জানা যায়। সুতরাং প্রথম অষ্টকে দেবী অন্নদা সম্পদের ঝাঁপি নিয়ে ভবানন্দ মজুমদারের গৃহে প্রবেশ করে তাঁকে রাজপদে অধিষ্ঠিত করলেন। কিন্তু শেষ ষটকে কবি উন্মোচন করলেন আপন অভিজ্ঞান - “কিন্তু চিরস্থায়ী অর্থ নহে এ সংসারে / চঞ্চলা ধনদা রমা, ধনও চঞ্চল’'। এখানে যেন কবির ব্যক্তিগত জীবনের আর্থিক ট্রাজেডির ছোঁয়া এসে লেগেছে। লক্ষ্মী চিরচঞ্চলা ছিলেন কবির কাছে। এই নিদারুণ অর্থকষ্ট তাঁর ব্যক্তিজীবনকে ছন্নজীবনের কষ্টভোগ করতে বাধ্য করেছিল। তবে অর্থ নয়, কীর্তিই স্থায়ী হবে ভবানন্দের, যা নির্মাণ করে গিয়েছেন কবি ভারতচন্দ্র রায়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যা চিরকাল স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নালোকের মতোই অমৃতরস ছড়িয়ে দেবে।
“জয়দেব’' সনেটটিও ব্যতিক্রমী। সংস্কৃত ভাষায় লেখা অপূর্ব রসমন্ডিত কাব্য কবি জয়দেবের “গীতগোবিন্দ”। রাধাকৃষ্ণ লীলা বিষয়ক কাব্যটি নিয়ে মধুসূদন লিখেছেন “জয়দেব’' সনেটটি। এখানেও  কবির ভক্তিভাব নয়, ভক্তি রসাশ্রিত কাব্যটির প্রভাব জনজীবনে কীভাবে দোলা দিয়েছে তার কথাই সনেটের রীতি ভঙ্গিমায় প্রকাশ করেছেন। সনেটটি এখানে তুলে ধরছি- 

জয়দেব 

চলো যাই, জয়দেব, গোকুল - ভবনে
তব সঙ্গে, যথা রঙ্গে তমালের তলে
শিখীপুচ্ছ - চূড়া শিরে, পীত ধড়া গলে
নাচে শ্যাম, বামে রাধা- সৌদামিনী ঘনে।
না পাই যাদবে যদি, তুমি কূতুহলে
পুরিও নিকুঞ্জরাজী বেণুর স্বননে!
ভুলিবে গোকুল - কুল এ তোমার ছলে,-
নাচিবে শিখিনী সুখে, গাবে পিকগণে
বহিবে সমীর ধীরে সুস্বর লহরী, -
মৃদুতর কলকলে কালিন্দী আপনি
চলিবে! আনন্দে শুনি সে মধুর ধ্বনি 
ধৈরজ ধরি কি রবে ব্রজের সুন্দরী? 
মাধবের রব, কবি, ও তব বদনে, 
কে আছে ভারতে ভক্ত নাহি ভাবি মনে? 

কৃষ্ণকথার অপূর্ব মাধুর্য “গীতগোবিন্দ’' এর সুরাশ্রিত কাব্যে যেভাবে ধরা পড়েছে, সেই মাধুর্যই রাধাকৃষ্ণ এর প্রেমকথাকে অপরূপ রূপে মূর্তায়িত করেছে। মধুসূদন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ব্যতিক্রমী স্বরে তাই বলছেন,  চলো কবি জয়দেব, গোকুলে যাই, সেখানে গিয়ে যদি সেই তমালতলায় রাধাকৃষ্ণ এর দেখা না পাই, তাহলে তুমিই বাঁশি বাজিও। দেখবে তোমার ছলনায় গোকুল সবকিছু ভুলে আনন্দে মেতে উঠবে, প্রকৃতি ও মানুষ এই চিত্ত - জাগানিয়া সুরে জেগে উঠবে। হয়তো কোনও ব্রজের সুন্দরী নিজেকে আর ধরে রাখতে পারবে না। তোমার এই বংশীধ্বনি শ্রবণে কেউ কি আর ভক্ত না হয়ে থাকতে পারবে?
 “অন্নপূর্ণার ঝাঁপি’' তেও সেই “অন্নদামঙ্গলে”র মতো সৃজনের জয়গাথাই দেখতে পাচ্ছি। ঈশ্বর তো কবির কল্পনায় হয়ে উঠছেন অন্নদা, হয়ে উঠছেন রাধা- কৃষ্ণ, চোখের সামনে কাব্য পাঠক দেখতে পাচ্ছেন গোকুল, তমাল বৃক্ষ,চঞ্চল গতিতে ছুটে চলা নদী কালিন্দী, শিখীচূড়ায় ত্রিভঙ্গ মুরারি মুরলীধর, ডানে ব্রজসুন্দরী শ্রীরাধা। কাব্যের অমৃতরসধারায় তৈরি হচ্ছে এক নতুন বাস্তব, কিছু কিছু ক্ষেত্রে একে প্রতিবাস্তবও বলা যেতে পারে। 
এখন আসা যাক বহুপ্রচলিত অপূর্ব সনেট “কপোতাক্ষ নদে’'র কথায়। কপোতাক্ষ নদের প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে  ইংরাজ কবি কোলরিজের সনেট সম্পর্কে একটি উক্তি -” A small poem, in which some lonely feelings is developed.’'

কপোতাক্ষ নদ
সতত হে নদ তুমি পড়ো মোর মনে।
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;
সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া-মন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!-
বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ- দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে? 
দুগ্ধ - স্রোতোরূপী তুমি জন্ম-ভূমি -স্তনে!
আর কি হে হবে দেখা? - যত দিন যাবে, 
প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে 
বারি - রূপ কর তুমি; এ মিনতি, গাবে 
বঙ্গজ জনের কানে, সখে, সখারীতে 
নাম তার, এ প্রবাসে মজি প্রেম- ভাবে
লইছে যে তব গান বঙ্গের সঙ্গীতে!

সত্যিই এক নি:সঙ্গ মানুষের নস্টালজিক অনুভবের বিষাদময়তা যেন সনেটটির ছত্রে ছত্রে  ছড়িয়ে আছে। এই সনেটটি চতুর্দশপদী কবিতাবলীর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সনেট। যখন কবি উচ্চারণ করেন “আর কি হে হবে দেখা” তখন এক বিমূর্ত বিষাদ সমগ্র কবিতাটির দেহেমনে ছড়িয়ে পড়ে। পিতার দ্বারা নির্বাসিত কবি আর কখনও নিজের পিতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারেননি। স্বদেশ তাঁকে টানতো, টানতো যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামের সেই কপোতাক্ষ নদ। “ সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে শোনে মায়ামন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!” পংক্তিগুলির গভীর বিষাদ অসহায়ত্ব ও দীর্ঘশ্বাসের ছোঁয়ায় হৃদয়স্পর্শী। 
“সায়ংকাল’' সনেটটিতে সূর্যাস্তকালীন সৌন্দর্য যে গরীয়সী ভাষায় বর্ণনা করেছেন তা অননুকরণীয়। ভাষায় গৌরব ও ওজস্বিতা এনে দিয়েছিলেন মধুসূদন। অজস্র তৎসমশব্দ, সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের মতো গভীর, দৃপ্ত, গৌরবোজ্জ্বল শব্দপ্রয়োগ, অনন্য উপমা,  অলঙ্কারবহুল ও অসাধারণ চিত্রকল্প নির্মাণের নিদর্শন “সায়ংকাল” সনেটটিতে পাচ্ছি। 

সায়ংকাল 

চেয়ে দেখ, চলিছেন  অস্তাচলে 
দিনেশ, ছড়ায়ে স্বর্ণ, রত্ন রাশি রাশি 
আকাশে।  কত না যত্নে কাদম্বিনী আসি
ধরিতেছে তা সবারে সুনীল আঁচলে!-
কে না জানে অলঙ্কারে অঙ্গনা বিলাসী? 
অতি ত্বরা গড়ি ধনী দৈব - মায়া - বলে।
বহুবিধ অলঙ্কার পরিবে লো হাসি-
কনক - কঙ্কণ হাতে, স্বর্ণ-মালা গলে!
সাজাইবে গজ, বাজী; পর্ব্বতের শিরে
সুবর্ণ কিরীট দিবে; বহাবে অম্বরে
নদস্রোত:, উজ্জ্বলিত স্বর্ণবর্ণ নীরে!
সুবর্ণের গাছ রোপি, শাখার উপরে 
হেমাঙ্গ বিহঙ্গ থোবে! - এ বাজী করি রে
শুভ ক্ষণে দিনকর কর-দান করে।

পশ্চিম আকাশে অস্তাচলগামী সূর্য। মুঠো মুঠো স্বর্ণালোক ও নানাবিধ রত্নরাজি আকাশে ছড়িয়ে তিনি যখন অস্তাচলগামী তখন মেঘরাশি তার সুনীল আঁচল বিছিয়ে সেই অলঙ্কারাদি, রত্নরাজি সংগ্রহ করছে সযত্নে। কাদম্বিনী অর্থাৎ মেঘাঙ্গনা যে অলঙ্কার বিলাসী তা কে না জানে! এক অনবদ্য চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন কবি। মেঘের বিচিত্র আকৃতির উপর যে স্বর্ণালোক পড়েছে তাতে মনে হচ্ছে এক নারী বিবিধ অলঙ্কারে সুসজ্জিত হয়ে পর্বতশিখরে সোনার মুকুট পরিয়ে দেবে, সাজাবে হাতি ও ঘোড়াকে। আকাশ সোনারঙা জলস্রোতে প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠবে, সোনারঙা গাছে সোনার পাখি এসে বসবে। এমন এক ওজস্বিনী ভাষায় এই  চমৎকার visual imagery নির্মাণ বাংলা সাহিত্যে মনে হয় এই প্রথম।  
বাংলাসাহিত্যকে বিবিধ অলঙ্কারে সম্পদশালী করলেও ব্যক্তিজীবনের নিদারুণ অর্থকষ্ট এই অমূল্য জীবনটি কেড়ে নেয় মাত্র উনপঞ্চাশ বৎসর বয়েসে, চতুর্দশপদী কবিতাবলী প্রকাশের ( ১৮৬৬) মাত্র সাত বছর পর ( ১৮৭৩)।
……………………………………………………….

তথ্যসূত্র - চতুর্দশপদী কবিতাবলী ( প্রথম প্রকাশ - ১৮৬৬) সম্পাদক - শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রী সজনীকান্ত দাস। ভূমিকা। 


# বিজয়া দেব।





...…................................................................







নস্ট্যালজিয়ার তিন দশক, সত্তর থেকে নব্বই 

 আমরা যারা পঞ্চাশের দশকের শেষ পর্যায়ে কিম্বা ষাটের দশকের প্রথমে জন্ম নিয়েছি, আমরা যে সময়কাল পেরিয়ে এসেছি, তা যেমন প্রকৃতি সংলগ্ন,  তেমনই যন্ত্রনির্ভর এবং জটিল। আমরা কুপির লম্ফ যেমন দেখেছি তেমনই দেখেছি বিদ্যুৎ এর আলোর কুহেলিকা।  যেমন দেখেছি বিস্তীর্ণ মাঠ, তেমনই দেখেছি ফ্ল্যাট বাড়ির হাইরাইজ, জায়গা সংকুলানের অভাব, যেমন দেখেছি মহীরুহের সারি, তেমনই দেখেছি বৃক্ষ নিধন। যেমন পেয়েছি মানবতার স্পর্শ, তেমনই দেখেছি বিশুদ্ধ কৌশল।  যেমন দেখেছি বিশুদ্ধ হৃদয় তেমনই দেখেছি মস্তিষ্কের নানাবিধ কারুকাজ, যেমন পেয়েছি খাঁটি, তেমনই পেয়েছি ভেজাল। পায়ে হেঁটে ইশকুল গেছি কয়েক মাইল হেঁটে,  ছেলেমেয়েদের পাঠিয়েছি ইস্কুলের গাড়িতে, কিম্বা ব্যক্তিগত গাড়িতে। এভাবেই সময় দেখিয়েছে তার নিয়ত পরিবর্তনশীল মুখ। সামনে এগিয়ে যাওয়া ও টেকনোলজির ক্রম উন্নতি,  মনুষ্যত্বের ক্রম অবনমন।  যদিও টেকনোলজির উন্নতির সাথে মনুষ্যত্বের অবনমনের কোনও গভীর যোগসূত্র আছে কিনা সঠিক জানা নেই। কার্যকারণ সূত্রটা ইভোলিউয়েশনের পর্যায়েই পড়ে,  তাই হয়তো ধীরে আমাদের অস্ত্বিত্বের অবতলে পরিবর্তনটি ঘটে, আমরা টের পাইনা, কখন কীভাবে এরকমটা হয়ে গেল তা নিয়ে হাজার প্রশ্ন জাগে মনে। ১৯৭০, ৮০ ও ৯০ এর দশক আমাদের তারুণ্যের সময়। জীবন ঘিরে থাকে তারুণ্য। তারুণ্যই পরিবর্তনের বার্তা আনে, তারুণ্য জয়গান সর্বত্র।  সবচেয়ে বড়ো কথা সেই সময়টায়  সুখদুঃখের অনুভব ভেতর ছুঁয়ে যায়। বিশেষ করে আমাদের তারুণ্যের সময়ে যন্ত্র সভ্যতা সেভাবে বিকশিত হয়ে ওঠেনি। এ দেশে তা ছিল একেবারেই প্রথম পর্যায়ে।  
এই কলমচাষীর জন্ম আসামে, বড় হয়ে ওঠা আসামে, শিক্ষা আসামে, শিক্ষকতার চাকুরি  আসামে। বিগত সাত বছর থেকে কলকাতাবাসী। সুতরাং আমার স্মৃতির সাম্রাজ্যলোক আসাম। 
আসামের ভৌগলিক অবস্থান নিয়ে কিছু কথা বলতেই হয়। পাহাড়-পর্বত জঙ্গলে ঘেরা হলেও জনবহুল এলাকা। বরাক নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বরাক উপত্যকা ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা।  দেশভাগের আগে বরাক উপত্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল পূর্ববঙ্গের ভেতর দিয়ে। বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ শহর ছিল শ্রীহট্টের একটি অংশ। দেশভাগের পর শ্রীহট্ট পূর্ববঙ্গে চলে যাওয়ায় বরাক উপত্যকার বাইরের সাথে যোগাযোগটা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনদিকে পাহাড় আর সমতলের রাস্তাটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে অন্যদেশে চলে গেছে। আমার জন্ম বরাক উপত্যকার দেওয়ান চা বাগানে।  বাবা ছিলেন দেওয়ান চা বাগানের মধ্যবঙ্গ ইশকুলের শিক্ষক। মধ্যবঙ্গ ইশকুলে ছিল তিনটি শ্রেণি। চতুর্থ,  পঞ্চম ও ষষ্ঠ। উচ্চ বিদ্যালয় ছিল চা বাগান থেকে আড়াই মাইল দূরত্বে। পয়লাপুল ছিল একটি গঞ্জ এলাকা। ওখানেই ছিল উচ্চ বিদ্যালয়। নেহরু উচ্চ বিদ্যালয়।  হেঁটে যেতে হতো। তখন পায়ে হেঁটে বুকের কাছে খাতা বইয়ের বোঝা আঁকড়ে ধরে বেশ কয়েকজন একসাথে পথ হাঁটতাম,  আর পিয়ার্সন ইশকুলের জন্যে মনটা আকুলিবিকুলি করতো। খুব আনন্দ করেছি পিয়ার্সন ইশকুলে। ক্লাশের লাগোয়া সবুজ চা গাছের প্রান্তর, আর সামনে নীলাভ সুউচ্চ বড়াইল পাহাড়শ্রেণি। বাবা, হেডমাস্টারমশাই,  হরিপ্রসাদ স্যার তাঁদের কথা মনে পড়ত। মনে পড়ত আমার ফেলে আসা সহপাঠীদের কথা। জ্যোৎস্না,  লীলা, শুকদেব। ওরা আর পড়বে না। শ্রমিক ছেলেমেয়েরা যারা ইশকুলে পড়তে আসতো তারা ঐ ষষ্ঠ শ্রেণির বেশি এগোত না। শুধু যারা খুব মেধাবী তাদের মা বাবা কষ্ট করে পাঠাত বড় ইশকুলে।
 স্থানীয় ভাষায় উচ্চ বিদ্যালয়কে বলতো বড় ইশকুল। যাই হোক, আমি পিয়ার্সন ইশকুলের এক দু'জন সহপাঠীকে পেলাম। আর নতুন বন্ধু পেলাম অনেক।  কিন্তু সেই আড়াই মাইল পথ হাঁটা দু:সাধ্য হয়ে পড়ল। সপ্তাহে সপ্তাহে এক দু' দিন  কামাই তো হতোই। এভাবেই সপ্তম শেষ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলাম। 
সেটা ১৯৭১। বাড়িতে নতুন মারফি রেডিও এলো। পুব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের লড়াই। ইন্দিরা গান্ধী পুব পাকিস্তানের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। অনেক শরণার্থী এসে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।  
আমাদের চা বাগানের কোয়ার্টার ছিল টিলার ওপরে। নীচে বসতো বিকেলের হাট শনি ও মঙ্গলবার। একদিন মঙ্গলবার বিকেলে এক ময়লা সাদা থান পরা ঘোমটা দেওয়া মহিলা এসে ঢুকল। আমাদের রান্নাঘর ও শোবার ঘরের মাঝখানে একটা লম্বা বারান্দা ছিল। মা মহিলাটিকে সেইখানে বসালেন। কিন্তু আমরা ভাষা পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম না। কি একটা ন ন করে একটুখানি অনুনাসিক সুরে সে কীসব বলে চলেছে কে জানে। একবার শুনলাম, ছেল্যা,  একবার শুনলাম ' আগুন '। তারপর আকাশের দিকে হাত তুলে "ভগমান "। মা তাকে একবাটি গুড় ও মুড়ি দিলেন। ওটা খেয়ে সে পাগলের মতো বেরিয়ে গেল,  পেছনে পেছনে আমি যাচ্ছিলাম,  কীরকম অলৌকিক কিছু মনে হচ্ছিল। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। হাটের ভেতর কখন যেন সে মিলিয়ে গেল। মা বললেন - মনে হচ্ছে নোয়াখালী কিম্বা চট্টগ্রামের ভাষা। কিন্তু কোথায় মিলিয়ে গেল সে এই রাতে?  কে জানে! মারফি রেডিওতে তখন থেকে থেকে বজ্রকণ্ঠ - ভায়েরা আমার....আর মুক্তিযুদ্ধের গান। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো,  আমাদের মিষ্টিসুরের রেডিওতে বাজছে - " এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা, তোমাদের ভুলব না..."
এদিকে ষাটের দশকের শেষ পর্যায়ে শুরু হওয়া নকশাল আন্দোলনের প্রভাব প্রতিক্রিয়া তখনও রয়ে গেছে। আমাদের নেহরু ইশকুলের দুজন শিক্ষক এই নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন।  এরা আমাদের বাড়ি আসতেন মাঝে মাঝে। আমাদের বড়দাদা এই সময়ে বামপন্থী ভাবধারায় দীক্ষিত হয়। পরবর্তীতে সিপি আই এম দলে যোগ দেয়। নকশাল আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে সম্ভবত "দেশব্রতী " নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হতো। একদিন দেখলাম সন্ধের পর  আমাদের বাতাবিলেবু গাছটার পাশে সমস্ত "দেশব্রতী" পুড়িয়ে দেওয়া হলো। শুনলাম পশ্চিমবঙ্গে নকশালদের ধরপাকড় চলছে এবং জলে নিয়ে ওদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করে বিকলাঙ্গ করে দেওয়া হচ্ছে। ১৯৭৭ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ দারুণ অস্থিরতার নজির গড়ে তোলে। 
১৯৭৪ এ আমি মাধ্যমিক পাশ করলাম। তারপর চা বাগান থেকে প্রায় আঠারো কিলোমিটার দূরে আসামের কাছাড় জেলার সদর শহর শিলচরের গুরুচরণ কলেজে ভর্তি হই। থাকতাম হোস্টেলে। প্রথম দিকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হোস্টেল থাকাটা দারুণ কষ্টকর ছিল। পরবর্তীতে সেই হোস্টেলই আমার কাছে আনন্দ নিকেতন হয়ে যায়। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। এত আনন্দ ও এডভেঞ্চার আর কখনও পাইনি এই দীর্ঘ জীবনে। আমরা চারজন করে একটা রুমে ছিলাম। রুমটা বেশ বড়। রাতে ঘুমিয়ে পড়ার পর নানারকম গল্প চলতো। তখন নতুন প্রেমে পড়ার বয়েস। বেশির ভাগ প্রেমের গল্পই চলতো। তখন বই পড়ার যুগ ছিল। হোস্টেল লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়তাম। দৈনিক কাগজ আনন্দবাজার রাখা হতো। সেটাও সুপার ম্যাডাম পড়ার পর এনে পড়তাম। তখন ছেলেমেয়েদের মেলামেশা এখনের মতো অতো খোলামেলা ছিল না। কথাবার্তা হতো, তবে খুব বেশি নয়। কো এডুকেশন কলেজ, সুতরাং একটু আধটু পেছন লাগা তো ছিলই। হোস্টেলে বসে রবিবার দিন স্যার ম্যাডামদের নিয়ে খুব চর্চা হতো, কার কেমন পড়ানোর রীতি, দেহের ভাষা এইসব নিয়ে হুল্লোড়।  স্যাররা খুব স্নেহ করতেন। কলেজে সবাই বলতো "হোস্টেল টিম"।
হলে সিনেমা গেছি মায়ের সাথে ও মামীমার সাথে শিলচরে। মনে পড়ে প্রথম  হলের সিনেমা দেখা। সিনেমাটি সত্যজিৎ রায়ের "গুপী গাইন বাঘা বাইন "। কলেজ হোস্টেলে আসার পর সিনেমা দেখার সুযোগ পেলাম। একসাথে ছয় / সাত জনের একটি দল, প্রতি রবিবার এক একটা গ্রুপ করে সুপার ম্যাডাম পারমিশন দিতেন। সে যে কী আনন্দ বলার নয়। হেঁটেই দল বেঁধে যাত্রা। পথের কোনও কোনও দুষ্টু ছেলের দল বলে উঠতো - হোস্টেল পার্টি ছুটছে রে। আজ জমিয়ে সিনেমা দেখবে। মুক্তি পেয়েছে মুক্তি... " সবাই মুখ টিপে হাসতো। ওইটুকুই। এছাড়া পথঘাটে নিরাপত্তা আছে এমনটাই অনুভব করতাম। "ধর্ষণ" শব্দটির সাথে পরিচিত ছিলাম না। 
১৯৭৮ এ গ্রাজুয়েশন করলাম। মাস্টার্স এর জন্যে চলে গেলাম গৌহাটি।  গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়, তখন আসামের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলা বিভাগে ভর্তি হলাম।  প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতি এবং গৌহাটি শহরের প্রকৃতি মুগ্ধতা দিল অশেষ।  বিশাল ছড়ানো ব্রহ্মপুত্র নদ। একদিন বৃষ্টির দিনে ঝাপসা নদীটাকে সমুদ্রের মতো মনে হচ্ছিল। রবীন্দ্রনাথের সেই "বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর" মনে পড়ছিল। "ওপারেতে বৃষ্টি এলো ঝাপসা গাছপালা / এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মাণিক জ্বালা / বাদলা দিনে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান/ বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর নদে এলো বান। " তখন তরুণ বয়েস। সাহিত্যকে আঁকড়ে ধরেছিলাম একমাত্র আশ্রয়ের মতো। প্রকৃতি আমাকে রোমাণ্টিক অনুভূতিতে ভরিয়ে দিত। নদীও মানুষের কবলে পড়ে হাঁসফাঁস করে, সেইসব ভয়ানক সত্য একেবারেই জানা ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ছাত্র সংখ্যা একেবারেই কম ছিল। আমাদের গুরুচরণ কলেজের জমজমাট ক্লাশ থেকে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের  ক্লাশরুমটা বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। বিভাগীয় প্রধান ড. সুকুমার বিশ্বাস স্যার দু:খ করে বললেন,  আগে এই ক্লাশরুমে প্রচুর ছাত্র ছিল, এখন তো শুনছি, ছাত্র কম হলে কোনও কোনও বিভাগ নাকি তুলে দেওয়া হবে।
 তখনও আমরা ওয়াকিবহাল নই যে আসামে সেই পুরনো উদগ্র জাতীয়তাবাদ ফের মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। 
১৯৭৭ সালে বামপন্থী দল বিধানসভা নির্বাচনে বেশ ক'টি আসনে জয়ী হয়েছিল।  শিলচরে আমাদের কলেজ ও আরেকটি বড় কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন  জয়ী হয়। গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদও এস এফ আই এর দখলে ছিল। কিন্তু তলে তলে সদৌ অসম ছাত্র সংস্থা তাদের শক্তি ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছিল। ১৯৭৯ এর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলো সারা আসাম ছাত্র সংস্থা। তারপর তো সেই পুরনো খেলা। "বঙাল খেদাও" আন্দোলনের নতুন রূপ। তখন ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী। বিক্ষোভ আন্দোলনে পরপর দু'বছর পরীক্ষা হলো না। দুটি শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে গেল। তবে তরুণ বয়েস অতো কিছু বোঝে না। আমরা বাংলা বিভাগের ছাত্র ছাত্রীরা এরমধ্যেই আনন্দ করেছি। পিকনিক গিয়েছিলাম সবাই খুব সুন্দর পাহাড়ি ঝরণার ধারে। জায়গাটির নাম কুলসি। জলে নেমে একে অপরের ওপর জল ছুঁড়ে দিচ্ছিলাম।  স্বচ্ছ পাহাড়ি জল। আরেকবার বাংলা বিভাগ থেকে ছবি তোলা হলো। ১৯৭৯ সাল,  সাদাকালো ছবি, ক্যামেরা বেশ খানিকটা দূরে স্ট্যান্ডের ওপর বসানো। ক্যামেরাম্যান  একটা বড় তেরপলের মতো কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেলল ক্যামেরাকে, তারপর নিজেও ঢুকে পড়ল আর আমাদের নির্দেশ দিচ্ছিল ডানদিক, বাঁদিক, ক্লোজ। আমাদের অতি প্রিয় দীপক সেন স্যার হাসি চেপে রাখতে পারছেন না। আর আমাদের তো কথাই নেই, আসলে গোটা দৃশ্যটাই অদ্ভুত লাগছিল।  দীপক সেন স্যার একটু আত্মভোলা মতো ছিলেন। মূলত কবিতা পড়াতেন, পড়াতে পড়াতে কবিতার ব্যঞ্জনার একেবারে ভেতরে চলে যেতেন।  মাঝে মাঝে হাসতেন আর আমরা স্যারের সাথে সাথে কিছু না বুঝেই হাসতাম। ক্লাশশেষে এ নিয়ে ফের হাসাহাসি চলতো। 
যাই হোক ,  বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জেরে সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হলো। পরপর দুটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হলো। ১৯৮২ সালে  ফাইনাল ইয়ার। প্রিভিয়াস পরীক্ষা দিয়ে তারপর ফাইনাল ইয়ারে উঠলাম। কবি বীরেন রক্ষিত স্যার পড়াতেন জীবনানন্দ দাশের "সাতটি তারার তিমির "। স্যার চিনিয়ে দিলেন পরাবাস্তবতা। পরাবাস্তববাদ বুঝে নেওয়ার পর জীবনানন্দ দাশের কবিতা অনেকটা বুঝতে,  জানতে এবং ভালবাসতে শিখলাম।  জীবনের তলে অতলে এবং অবতলে বয়ে যাওয়া স্বপ্নিলতার নীলাভ কুয়াশা অস্ত্বিত্বে আচ্ছন্নতা যোগ করল। পৃথিবীকে, পরিপার্শ্বকে, মানুষকে নতুন করে চিনতে ও দেখতে শিখলাম। রক্ষিতস্যার বেশ নামী কবি ছিলেন। স্যারের কবিতা সংগ্রহ করে পড়লাম, তেমন কিছু বুঝতে পারলাম না।  স্থির করলাম আজ স্যারকে জিজ্ঞেস করব,  স্যার আমাকে অবসর সময়ে আপনার এই কবিতাটা একটু বুঝিয়ে দেবেন? 
স্যার ক্লাস থেকে বেরোতেই পিছু নিলাম। কথাটা বলতেই স্যার কুন্ঠিত স্বরে বলে উঠলেন,  না না ও কিছু নয়, আরে ওসব কিছু নয়, বলে চটপট স্টাফরুমে ঢুকে ভয়ে ভয়ে মুখ ফিরিয়ে দরজায় তাকালেন। 
মাস্টার্স করার কথা ছিল ১৯৮০ তে, জাতীয়তার জিগিরে আর দ্রোহে ১৯৮২ তে মাস্টার্স করলাম। 
আশির দশকে অনেক স্মৃতি। টানাপোড়েনও যেমন, স্বস্তিও তেমন। আশির দশকের একেবারে প্রথমে রিলিজ হলো তিনটি অসাধারণ বাংলা সিনেমা।  দুটিতে সংকেত ও ব্যঞ্জনার সমাবেশ,  আর একটি সহজ সরল সাধারণ রোমান্টিক, কিন্তু বড্ড পরিচ্ছন্ন- "হীরক রাজার দেশে", "বাঞ্ছারামের বাগান",  "দাদার কীর্তি"। দুটি সিনেমা ভাবাল, চিন্তার দিক পরিবর্তন করল, "দাদার কীর্তি" অনাবিল আনন্দ দিল। 
সত্তরের দশকে সিনেমা দেখেছি কম,  ঐ হোস্টেল থেকে যেগুলো দেখা, মৃণাল সেনের "মৃগয়া" দেখেছিলাম, আরও কিছু বাণিজ্য সফল সিনেমা। জীবনের বাস্তবতা সংলগ্ন সিনেমাগুলো দেখেছি পরে। টিভি পুরোপুরি বাড়ি দখলের পর। গৌহাটিতে হিন্দি সিনেমা দেখেছিলাম "সিলসিলা"। সেই সত্তর আশীর দশককে অনায়াসেই চিহ্নিত করা যায় সিনেমার বাঁকবদলের কাল বলে। শৈল্পিক গুণ সহ সিনেমায় বহির্জগতের সাথে অন্তর্লোক চিহ্নায়ক সিনেমাকে বলা হতো "আর্ট ফিল্ম"। এখন সে শব্দের ব্যবহার আর দেখতে পাই না। তখন হিন্দি সিনেমায় রাজত্ব করছেন অমিতাভ বচ্চন, শশী কাপুর,  মিঠুন চক্রবর্তী,  ঋষি কাপুর, শাবানা আজমী, নাসিরুদ্দিন শাহ, স্মিতা পাতিল, শর্মিলা ঠাকুর। সিনেমার জগত, গানের জগত, সাহিত্যের জগত সব কিছুতেই যেন অসাধারন সব সৃজন। যদি বলি সত্তর আশী ও নব্বুইয়ের দশক সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিনোদনের জগতে " golden era of twenth century "  তাহলে বোধহয় বাড়িয়ে বলা হয় না। 
১৯৮৫, আমার কাছে এক উল্লেখযোগ্য বছর। কারণ ওই বছরে আমি শিক্ষকতার মহান ব্রতে নিযুক্ত হই। ১৯৮৭, আমার শুরু হয় আমার জীবনসাথীর সাথে পথচলা। 
আবার আশির দশঅক্ট আসামে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন,  পাঞ্জাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন,  ফলশ্রুতিতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজের দেহরক্ষীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলেন। 
আশির দশকে প্রথম এদেশের ঘরে ঘরে টেলিভিশন এলো। ৩১ শে অক্টোবর, ১৯৮৪,  প্রধানমন্ত্রী নিহত হন। তখন আমাদের শিলচরের বাড়িতে গোটা পাড়ায় মাত্র একটি টেলিভিশন ছিল। যাঁর বাড়িতে টেলিভিশন ছিল, তিনি পাড়ার গলিপথে একটি টেবিল বসালেন,  তার উপর সাদাকালো টেলিভিশন সেটটি বসালেন।  পাড়ার, অন্য পাড়ার লোক এসে ভিড় করে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীর অন্ত্যেষ্টি দেখল। কেউ কেউ চোখের জল মুছল। নশ্বর দেহ পঞ্চভূতে লীন হয়ে যাবার পর ভারাক্রান্ত মনে যে যার বাড়িতে ফিরে গেল। 
ক্রমাগত পরিবর্তন চলছিল। মাস তিনেকের ভেতর আমাদের ঘরে সাদাকালো টেলিভিশন এলো। শুধু জাতীয় চ্যানেল। প্রথমে কিছু বিজ্ঞাপন ও খবর পরিবেশন হতো রেডিওর মতো এক একটি অধিবেশন করে। এরপর চালু হয় সিরিয়াল- নুক্কড়, বুনিয়াদ, ভারত এক খোঁজ, হম লোগ, মালগুডি ডে'স ইত্যাদি।  প্রতিটি সিরিয়ালের এক সামাজিক, রাজনৈতিক কিম্বা সাংস্কৃতিক গূঢ় ভাষ্যলিপি ছিল।রমেশ সিপ্পির" বুনিয়াদ " ছিল দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত পাঞ্জাবে ছিন্নমূল মানুষদের পুনর্বাসনের লড়াইয়ের ওপর তৈরি।  

নব্বুইয়ের দশকে এসে আমাদের শিক্ষক পিতাকে আমরা  চিরতরে হারাই। সেটা ১৯৯৪ সালের ৪ ঠা জুলাই।  অল্পদিনের রোগ ভোগ করে হঠাৎ করেই বাবা চলে গেলেন। জীবনে প্রথম পরিবার থেকে সবচাইতে অপরিহার্য মানুষটি হারিয়ে গেলেন একেবারে আচমকা।  মৃত্যু যে এভাবে আসে জানতাম না, অথবা জানলেও মৃত্যুর কথা কে ভাবে? জীবন তার যাবতীয় উষ্ণতা দিয়ে আমাদের আগলে রাখতে চায়। তাই আমরা জীবনমুখী, আলোই আমাদের হাত ধরে উর্বর অনুর্বর পথ হাঁটার শক্তি যোগায়। তাই বাবার চলে যাওয়াটা মেনে নিতে আমাদের কয়েকটা দশক লেগেছিল। বাবা চলে গেলেন আর আমার হাতে তুলে দিয়ে গেলেন কলম। জীবনটা এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নিল ওই নব্বুইয়ের দশকে। 
১৯৯১ সাল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসীমা রাও, দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে  বিশ্ব প্রতিযোগিতার বাজারে উন্মুক্ত করে দিলেন, যাকে বলা হতো বিশ্বায়ন।  সেই বিশ্বায়ন নিয়ে শুরু হয় বিস্তর আলোচনা। আমজনতার হাটে এই শব্দটি নতুন,  তাই এ নিয়ে বিস্তর আলাপ আলোচনা চলেছিল। সেই থেকে অর্থনৈতিক পরিবর্তনশীলতা দ্রুত, দ্রুততর, দ্রুততম ও দ্রুতগামী হলো। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বাজার তৈরি হতে লাগলো। পণ্যসংস্কৃতির সাথে  শিক্ষা, চিকিৎসা,  সংস্কৃতি,  সাহিত্য, শিল্পের মিথস্ক্রিয়া জন্ম দিল এক নয়া বাস্তবতার যেখানে নিজের কথা নিজে বলতে হয়। যেমন কোনও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি নিজের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিক্রির জন্যে উচ্চকিত বিজ্ঞাপন দেয় বা শপিং মলে মাইক্রোফোন হাতে সুবেশী যুবক বা যুবতী পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দিতে থাকে আজকাল যারা শিক্ষা সাহিত্য শিল্পের বাজারে আছেন তাঁরা নিজের সৃষ্টিকে নিজেই বিজ্ঞাপিত করেন মানে সংশ্লিষ্ট লবাজারে সঠিক প্রতিযোগী হিসেবে উপস্থাপিত করতে প্রয়াসী হোন। এখন গ্রামীণ সংস্কৃতিও ছুটছে সেই বাজারের ধরতে। 
যাইহোক অতীত কখন যেন টেনে নিয়ে এলো বর্তমানে। কখন যেন চলে এলাম বিষয় ছেড়ে বিষয়ান্তরে, বিষয়ান্তর বুঝি ধরে রাখে বিষয়কে, কিম্বা বিষয় বিষয়ান্তরকে। 

# বিজয়া দেব







দেশভাগ ও চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখা 



দেশভাগ, ভারতবর্ষের জন্যে এক অভিশাপ। সেই দেশভাগের যন্ত্রণা ক্ষতবিক্ষত করেছিল সমকালীনতা থেকে অনেকটা অগ্রসর চিত্রপরিচালক অনন্য প্রতিভাধর ঋত্বিক ঘটককে। “মেঘে ঢাকা তারা”, “সুবর্ণরেখা”, “কোমল গান্ধার” এই তিনটি চলচ্চিত্রেই তিনি দেশভাগের প্রসঙ্গ এনেছেন।  ১৯৬০ সালে রিলিজ হয় “মেঘে ঢাকা তারা।

মাত্র আটটি ছবি করেছিলেন ঋত্বিক-

 ১. অযান্ত্রিক (১৯৫৮)

২.পলাতক ( ১৯৫৯)

৩.মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)

৪. কোমল গান্ধার (১৯৬১)

৫. সুবর্ণরেখা ( ১৯৬৫)

৬. তিতাস একটি নদীর নাম(১৯৭৩)

৭. নাগরিক (১৯৭৭)

৮. যুক্তি তক্কো আর গপ্পো ( ১৯৭৭)

এরমধ্যে দেশভাগ প্রসঙ্গ নিয়ে ত্রয়ী ছবি থেকে “সুবর্ণরেখা’' নিয়ে সামান্য আলোকপাত করছি সংক্ষিপ্ত পরিসরে। 

“সুবর্ণরেখা” ছবিটি রিলিজ হয় ১৯৬৫ সালে। চলচ্চিত্রের নির্মাণকাল ১৯৬২ থেকে। একটি নদী সুবর্ণরেখা, সমস্ত মানুষের পুনর্বাসনের লড়াই এর পাশাপাশি বয়ে চলেছে তার উদাসীন প্রকৃতিকে নিয়ে। প্রশ্ন জাগে কেন ঋত্বিক এই চলচ্চিত্রের নাম সুবর্ণরেখা রাখলেন? নদীর উদাসীন প্রকৃতির সাথে কি শরণার্থী মানুষের জন্যে পারিপার্শ্বিকের ঔদাসিন্যের কোনও সাযুজ্যের কারণে? না কি নদীও এমনই অসহায়! তাকেও মানুষ নিজের জন্যে অসদ্ব্যবহার করে থাকে নিজের স্বার্থে?  ঈশ্বর চক্রবর্তী নামে এক শরণার্থী যুবকের পুনর্বাসনের সময় এবং পুনর্বাসিত জীবন থেকে ফের উৎখাতের সময়ের সাক্ষী নদী সুবর্ণরেখা। এই জীবনযুদ্ধের দুটি প্রান্তদেশের সাথে সে জুড়ে আছে। 

“সুবর্ণরেখা’' ছবিটির প্রেক্ষাপট ১৯৪৮ সালের ২৬ শে জানুয়ারি, জালিয়ানওয়ালাবাগ দিবসে। চলচ্চিত্রটির শুরুতে তাই বলা হয়েছে। শরণার্থীরা কলকাতার খোলা জায়গা দখল করে কলোনি গড়ে তুলছে, প্রথম দৃশ্যেই দেখানো হচ্ছে শরণার্থীরা কলোনি স্থাপন করে ইশকুল প্রতিষ্ঠা করছেন, পতাকা উত্তোলন করলেন যিনি তিনি হবেন এই ইশকুলের শিক্ষক, তাঁর নাম হরপ্রসাদ, তিনি পড়াবেন সংস্কৃত ও বাংলা, আরেকজন শরণার্থী যাঁর নাম ঈশ্বর চক্রবর্তী, তিনি পড়াবেন ইতিহাস ও ইংরেজি। এরপরই  দেখা যাচ্ছে কলোনিতে আশ্রয় খুঁজছে ঢাকা থেকে আসা বিধবা বাগদিবউ কৌশল্যা, সঙ্গে রয়েছে তার ছোট্ট ছেলে অভিরাম। এই সময়েই জমিদারের গুন্ডারা এসে তাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, কারণ এই কলোনিতে পাবনার মানুষকে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে, তাছাড়া কৌশল্যা বাগদি, অন্ত্যজ শ্রেণীর।  যেভাবে তাকে টেনে হিঁচড়ে  ট্রাকের পেছনে তোলা হলো তাতে তার ছোট্ট ছেলে অভিরাম তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। ওদিকে হরপ্রসাদ তখন ছাত্রছাত্রীদের  দেশভক্তির বাণী উচ্চারণ করাচ্ছেন,  এদিকে কাঁদতে কাঁদতে গাড়ির পিছু পিছু ধাওয়া করছে অভিরাম। ছবির প্রথমেই মার কাছ থেকে  বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল অভিরাম,  ঠিক আরেক মাতৃ বিচ্ছিন্নতার ঝলক আমরা দেখছি ছবির একেবারে শেষ পর্যায়ে। এই মর্মান্তিক দৃশ্যের এক নিগূঢ় সংকেত যেন দর্শককে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। এই মা কে?  তিনি কি দেশমাতৃকা? তার সাথে সন্তানের এই যে বিচ্ছেদ, তাই হয়তো এই বিভাজিত দেশের একমাত্র নিয়তি।


ঋত্বিক জীবনকে দেখেছেন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এবং অবশ্যই নেতিকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন। ইতি নয়, নেতি, না কি নেতি নেতি করতে করতে ইতিকেই হৃদয় দিয়ে চেয়েছিলেন তিনি?  তাঁর ছবি  একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে দর্শককে দগ্ধ করে দেয়, করে দেয় ছিন্নভিন্ন, বিক্ষত। জীবনের  বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে এমনভাবে আর কেউ দেখাতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। সবাই বাঁচতে চায়, কিন্তু বাস্তবতার কাছে পরাভূত হয়, সত্যি হয়ে ওঠে মৃত্যু। হ্যাঁ, মানুষের জীবনে চরম ও পরম সত্যি মৃত্যু। কিন্তু এতো মৃত্যু! দেশভাগের অভিশাপ থেকে  কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারে না হরপ্রসাদ, বাগদিবউ কৌশল্যা, সীতা, অভিরাম এবং বাঁচতে বাঁচতে বাঁচার যুদ্ধে হেরে যাওয়া ঈশ্বর। 

ঈশ্বর ছিল এক মেধাবী যুবক ওপার বাংলায়, যা ১৯৪৭ থেকে হয়ে গেল পাকিস্তান। সে মাটি তাকে ছাড়তে হয়েছে।একদিন কলকাতার পথেঘাটে যখন সে কাজ ও আশ্রয়ের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন এক গাড়ি তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে যায়। ভেতরে বসে আছে তাঁর একসময়ের সহপাঠী রামপ্রসাদ। সে সম্ভবত হিন্দিভাষী,  ঈশ্বরকে সে গাড়িতে তুলে নেয়। এই রামপ্রসাদই তাঁকে ঘাটশিলা থেকে খানিকটা দূরের গ্রাম ছাতিমপুরে কাজের সন্ধান দেয়। জায়গাটি সুবর্ণরেখা নদীর তীরে। সেখানে রামপ্রসাদের একটি চালকল ও আরেকটি কারখানা রয়েছে। স্বল্প মাইনেতে সে খুঁজছে  মিল দেখাশোনার জন্যে একজন দক্ষ মানুষ। প্রথমে কাজ নিতে চায়নি ঈশ্বর।  পরে অনন্যোপায় হয়ে সে সীতা ও অভিরামের হাত ধরে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে আসে। কাজে যোগ দেয়। দুটি ছোট ছেলেমেয়ে সীতা ও অভিরাম হয়ে যায় পরস্পরের খেলার সাথী। তবে পড়াশোনা করতে  অভিরামকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কলকাতায় হস্টেলে। আর সীতার গানের কণ্ঠ সুমধুর হওয়ার জন্যে তাকে গান শেখানো শুরু হয় শুধু, পড়াশোনা নয়। আবহযন্ত্রানুসঙ্গের সঙ্কেতধর্মিতা প্রথমেই যেন অনেক কিছুই বলে দেয়। সীতার নাম এবং গান শেখানোর শুরুতে ঘুঙুরের আওয়াজ এবং কিছু কিছু সংলাপ বলে দেয় যেন সীতার জীবনের অন্তিম পরিণতি কী হতে চলেছে। অনেক কথা, অনেক বিষয় সমাজমানসের বিচিত্র দিক চলচ্চিত্রে এনে জড়ো করেন পরিচালক। মানুষ সবাই, কিন্তু মানবিকতার ভয়াবহ খামতি তাদের পরিপূর্ণ মানুষ হতে দিল না, যেন এই দু:খকে হৃদয়ের গভীরে ধারণ করে রেখেছিলেন ঋত্বিক,তাঁর চলচ্চিত্রের অনুপুঙ্খে এই ব্যাপারটিকেই বারবার ঝলসে উঠতে দেখি। সীতাকে যখন ভুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মিলের লোক তখন ছোট্ট মেয়েটাকে ভোলাচ্ছে এমনি সংলাপে যা অসাধারণ সংকেতবাহী। অভিরামকে পাঠানো হলো হোস্টেলে কিন্তু সীতাকে নয়, তাকে শেখানো হলো গান। আবহে থেকে থেকে ঘুঙুরের আওয়াজ। সীতার কণ্ঠে “ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরির খেলা’' গানটি বেশ কয়েকবার ব্যবহৃত হয়েছে। এই বিশাল প্রকৃতি, ধানক্ষেতে রৌদ্রছায়ার খেলা নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে যাওয়ার সৌন্দর্য যেমন মুগ্ধতা এনে দেয়, তেমনই রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি খেলা প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির মাঝের দোলাচলতার কথাও বলে। 

ঈশ্বর চক্রবর্তীর পদোন্নতি হলো, ম্যানেজারের পদে বহাল হবার পর সে এক সুস্থির সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন দেখল। সেই সুখবর নিয়ে যখন বাড়ি ফিরছে তখন দেখল সুবর্ণরেখার উষর তীরে বসে সীতা গাইছে ভৈরবী সুরে ‘আও দেখো ভোর ভঁই’’। ঈশ্বর দাঁড়িয়ে শুনছে, দূর থেকে, সুমধুর কণ্ঠ সীতার। অত:পর কাছে গিয়ে ঈশ্বর বলছে - তুই অনেকটা বড় হয়ে গেছিস। - নিজের পদোন্নতির সংবাদটি বোনকে দেয়,এবং বলে এতো মন খারাপ করা উদাসীন গান কেন সীতার? অভিরামের খবর দেয়,আর বলে অভিরাম পড়াশোনায় উন্নতি করেছে, তবে সে নাকি সাহিত্য লিখছে, একটা লেখা ঈশ্বর পড়েছে, পড়ে তার দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। সীতা তখন বলছে, চারপাশে তো তাই ঘটে চলেছে।  ঈশ্বর বলে - মানুষ আনন্দ খোঁজে, স্বস্তি খোঁজে, সুতরাং তাই লেখা উচিত,  ওসব দু:খ ইত্যাদি মানুষ পছন্দ করে না, নেয় না। কখন এই কথাগুলি বলছে ঈশ্বর? যেদিন তার প্রমোশন হয়েছে, সুখসূর্য উঁকি দিচ্ছে মাত্র। এভাবেই হয়তো নিজে সুখের সন্ধান পেলে দু:খের জগত থেকে মানুষ পলায়ন করতে চায়, দু:খীর যন্ত্রণা প্রাণপণে এড়িয়ে যায়। এরই মধ্যে অভিরাম এসে উপস্থিত হয়, সীতা ও অভিরাম বুঝতে পারে তারা পরস্পরকে ভালবাসে। উন্মুক্ত প্রকৃতির সামনে বসে চুপি চুপি তারা নিজেদের অনুভূতি পরস্পর বিনিময় করে। এই গোপনীয়তা বুঝিয়ে দেয় সমাজ কিম্বা ঈশ্বর এই ভালবাসা মেনে নেবে না। মেলা থেকে কিনে এক সাঁওতালি মালা সীতাকে উপহার দেয় অভিরাম। ঈশ্বর গোপনে তা দেখে ফেলে। সে অভিরামকে জার্মানিতে পাঠিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াবে, এই ছিল তার স্বপ্ন। সুতরাং পারিবারিক বিরুদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয় সীতাকে। এদিকে হঠাৎই রামবিলাস এসে উপস্থিত।  সে এখন ঈশ্বরের পরিচালক, কারণ চাকরিটা সে-ই দিয়েছে। অভিরামকে দেখে সে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করে, এবং অজ্ঞাতকুলশীলকে যে ঈশ্বর আশ্রয় দিয়েছে, তা সে মোটেই ভালো চোখে দেখে না। সে জাতিভেদ বর্ণভেদ মানে, সে কথা সে সাফ জানিয়ে দেয় ঈশ্বরকে। 

ঈশ্বর এখন মাথা উঁচু করে বাঁচার সন্ধান পেয়েছে, জার্মানিতে অভিরামকে পাঠানোর পরিকল্পনা সে বাতিল করে অভিরামকে কলকাতায় চলে যেতে বলে। সীতা অভিরামকে ভালবাসে জেনে সীতার মৃত্যুকামনা করে। তারপর সীতার বিয়ে দেবার জন্যে তড়িঘড়ি বন্দোবস্ত করে ফেলে। এদিকে অভিরাম যখন ছাতিমপুর ছেড়ে চলে যাচ্ছে কলকাতা, তখন গাড়ি থেকে অসুস্থ এক মহিলাকে স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি চলে যায়। মহিলা স্টেশনেই মারা যান। মহিলার শেষের দিকের কথায় অভিরাম জানতে পারে ইনিই তার হারিয়ে যাওয়া মা। এরপর পরপর কিছু ঘটনা, যদিও পরিচালক সময়ের ব্যবধানটুকু পর্দায় ব্যক্ত করেছেন  কয়েক বৎসর পর ইত্যাদি লিখে।

  সীতার বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠে অভিরামের সাথে কলকাতা পালিয়ে যাওয়া, যাওয়ার সময় বিয়ের মুকুট সুবর্ণরেখার জলে ফেলে যাওয়া, এই মুকুটের নদীর জলে ভেসে যাওয়ার শটটি বেশ কিছু সময় জুড়ে দেখানো যেন ইঙ্গিত বহন করে সীতার ভবিষ্যত সাংসারিক জীবনের স্থায়িত্ব নিয়ে, যাকে  লাল সঙ্কেতবাহী অঞ্চল বলা হয়, তা যেন ভবিতব্যের মতো কতকাল থেকে সীতার জন্যে অপেক্ষা করে আছে। 


অভিরাম পড়াশোনা করেও দাঁড়াতে পারেনি, লেখক হতে পারেনি, একটি সন্তান হয়েছে অভিরাম ও সীতার, নাম তার বিনু। শেষ পর্যন্ত ড্রাইভার হতে গিয়ে প্রথম দিনই সে পথদুর্ঘটনায় নিহত হয়। অভিরামের মৃত্যুর আগেই টাকাপয়সার অভাবের জন্যে  এক মহিলা সীতাকে গান গেয়ে টাকা রোজগারের কথা বলেছিল। সীতা তখন বুঝতে পারেনি গানের সাথে দেহব্যবসায় জড়িত, তবে অভিরাম বুঝতে পেরেছিল। অভিরামের মৃত্যুর পর সীতা সেই পথেই গেল বিনুকে বাঁচানোর জন্যে। এদিকে হরপ্রসাদের স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে। জীবনে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা দুটি মানুষ, ঈশ্বর ও হরপ্রসাদ, কলকাতায় নামী দামি মদের দোকানে বসে মদ খায়। চিরকুমার ঈশ্বর দেহব্যবসার মহল্লায় ঢুকে যে নারীকে পায় সে তার বোন সীতা। সীতা তার দাদাকে দেখে বঁটি দিয়ে নিজেকে ছিন্নভিন্ন করে। 

শেষ দৃশ্যে আবার সেই পিতৃ-মাতৃহীন পুত্র বিনু ঠিক তার বাবা অভিরামের মতোই মামা ঈশ্বরের হাত ধরে, যেন এ এক ঘূর্ণাবর্ত। সে ছুটছে ওই নদী  সুবর্ণরেখার দিকে, মামাকে ডাকছে তাড়াতাড়ি তার সাথে যাওয়ার জন্যে। এদিকে ঈশ্বরের কাছে চিঠি এসেছে তাঁর চাকরির জায়গায় অন্য একজনের নিযুক্তি হয়েছে। তাড়াতাড়ি যেন ম্যানেজারের বাংলো খালি করে দেওয়া হয়। ঈশ্বর এখন নিরাশ্রয়, নিরালম্ব, তাঁর প্রাণশক্তি ফুরিয়ে আসছে, অথচ বিনুর অফুরন্ত প্রাণশক্তি, সে নদীর দিকে ছুটে চলেছে, আর মামাকে বলছে তাড়াতাড়ি আসো, তুমি বুড়িয়ে গেছ।

আদ্যন্ত একটি কাহিনি থাকা সত্ত্বেও বলা ভালো সুবর্ণরেখায় কোনই কাহিনি নেই। আছে রামায়ণের সীতার কথা মিলের পূর্বতন মিলের ম্যানেজারের মুখে। প্রতিটি দৃশ্য সুপরিকল্পিত এবং রূপক প্রতীক ব্যঞ্জনার সহযোগে অনেকটা কাব্যিক, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ ইত্যাদির সংমিশ্রণে আদ্যন্ত এক রূপকাশ্রয়ী চলচ্চিত্র।  পরপর এত মৃত্যু স্বাভাবিক মনে না হলেও স্বাভাবিক যেহেতু এতে কাহিনির চাইতে সামূহিক রাজনৈতিক ও কর্তিত বঙ্গের পরিস্থিতিকে গুরুত্বময় করে তোলা হয়েছে, সুবর্ণরেখার তীরভূমি বড্ড উষর, বড্ড ধুলোমলিন। 


……………………………..


# বিজয়া দেব। 


তথ্যসূত্র - অন্তর্জাল। উইকিপিডিয়া 

কৃত্তিবাস -১৬ নভেম্বর সংখ্যা। 

চলচ্চিত্র - সুবর্ণরেখা
























;