Thursday, 5 November 2026

জগদীশ গুপ্তের গল্প: কিছু আলোকপাত

 ১

"দেওয়ালে কপাল ঠুকে নিজেকেই জন্মাবে আবার 

কোনোক্রমে 
তোমার এ ইচ্ছা ছিল। পাওনি কোথাও 
অভ্যর্থনা। " ( "জগদীশ গুপ্ত " - মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়) 

৷ কবি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় "জগদীশ গুপ্ত" কবিতার দুটি পংক্তির মধ্য দিয়েই ব্যাখ্যা করে নিয়েছেন জগদীশ গুপ্তের গল্পের বিশেষতা ও তাঁর মনোপ্রকৃতির। জনপ্রিয়তা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা লেখক মাত্রেরই থাকে। কিন্তু কিছু লেখক সমসময়ের থেকে এগিয়ে থাকার কারণে এবং  লেখ্য জগতের নানাবিধ গ্রন্থিল জটিলতার কারণে পাঠকপ্রিয়তা পান না। 

৷  জগদীশ গুপ্ত "কল্লোল" সমকালীন।  কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকরা রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রকেন্দ্রিক পরিমন্ডলে পাঠকের দৃষ্টির আচ্ছন্নতা ভাঙবার জন্যে অভিজাত ও মধ্যবিত্তের ভাবপ্রবণতাকে ভাঙতে শুরু করলেন অনেকটা যেন হাতুড়ির আওয়াজে।  তাঁদের লেখায় ব্রাত্যজনেরা ভিন্নতর মূল্যবোধ নিয়ে কোলাহল করতে করতে যেভাবে সাহিত্য জগতে ভিড় জমাতে লাগল, জগদীশ গুপ্ত কিন্তু ঐ পথ দিয়েই গেলেন না, আলাদা হয়ে একা একাই তাঁর নিজস্ব আলো নিয়ে নিজের পথেই চললেন।  এ যেন এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রবাহ, উৎস থেকে পরিণামে একেবারেই একক। তাঁর সেই চলার পথ সাধারণের জন্যে অবশ্য উন্মুক্ত অবারিত হলো না। 
৷৷ জগদীশ গুপ্তের বাচনভঙ্গি ঝরঝরে,  আকর্ষক গদ্যে তা মোহময়, তবু যে তা বৃহত্তর পাঠকশ্রেণীর কাছে সেভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেল না, তা হতে পারে তার চরিত্রের মনোবিশ্লেষক লেখনির দুরূহতার জন্যে, অথবা সময় থেকে অনেকটা অগ্রসর গল্পভাবনার জন্যে।
৷ জগদীশ গুপ্তের দৃষ্টিটাই বুঝিবা বক্র ছিল। তাই সমাজের অন্ধকার, মনের গভীরের অন্ধকারের গোপন কুঠুরিগুলি উন্মোচনে তাঁর কলমের তির্যকতা লক্ষণীয়ভাবে মগ্ন পাঠককে আলোড়িত করে। 
তাঁর স্ত্রী চারুবালা গুপ্ত বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন, 
" আমার শ্বশুরবাড়ির খুব কাছেই, মানে বাড়ির জানালা দিয়ে দেখা যেত, একটা ছোট পতিতাপল্লী। পরে আগুন লেগে ওদের ঘরগুলো পুড়ে যায়।.... খুব ছোট বয়সে অন্তত ওঁর ৩/৪ বৎসর বয়স পর্যন্ত এই পতিতাদের কেউ কেউ ওঁকে খুব আদরযত্ন করে সারাদিন কাছে রেখে দিত। একবার ছোটবেলায় উনি ড্রেনের মধ্যে পড়ে যান। ওরাই ওঁকে ড্রেন থেকে তুলে বাঁচায়। (স্ত্রীর চোখে লেখক জগদীশ গুপ্ত)। 
অর্থাৎ জগদীশ গুপ্ত এই পতিতাদের অতি কাছ থেকে দেখার সুযোগ ছোটবেলাতেই পেয়েছেন।  এইসব হতভাগ্য নারীদের কোমল হৃদয়বৃত্তির উষ্ণতা তাঁকে স্পর্শ করেছে। তিনি এই জিজ্ঞাসায় জর্জরিত হয়েছেন কেন এরা সুস্থ জীবন পেল না!  যে সমাজ নারীকে পণ্যে পরিণত করতে বাধ্য করে, সেই সমাজের লেখকের দৃষ্টি তো বাঁকা হবেই, নৈরাশ্য এসে তাঁর লেখনির মুখে দানা বাঁধবেই। তাই কি তাঁর চরিত্ররা এমন সব মনোভাব নিয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ায়, যে মনোভাব মানুষের মনের নিষ্ঠুর ও নৃশংস অংশটির দিকে দিকনির্দেশ করে। হয়তো ছোটবেলাতেই সামাজিক অন্যায়ের প্রতিচ্ছবি ঘনিষ্ঠভাবে অবলোকন করে তিনি আর সরলরেখায় জীবনকে দেখতে পারেননি। তাই কখনও কখনও নিষ্ঠুরতা ও জান্তব প্রবৃত্তি তাঁর গল্পে কেন্দ্রীয় হয়ে দাঁড়ায়। 
  সামাজিক অসমবিন্যাসের ফলে উৎপন্ন অন্যায় থেকে সৃষ্টি হয়েছে পতিতাদের। যারা তাদের সৃষ্টি করেছে তারাই তাদের তীব্র ঘৃণা দিয়ে আলাদা করে রাখে, সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে দেয় না। সেজন্যে তাঁর গল্পে দাম্পত্য সম্পর্কগুলি চিরন্তন মানবিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। বরং গল্পকার বিশেষ বিশেষ পুরুষ চরিত্রের লালসাতাড়িত অংশকে টেনে বাইরে নিয়ে আসেন আর তাঁর কলমের অগ্রভাগের বঙ্কিমতা দেখায় আসলে বিবাহিত নারীরা পতিতাদের চাইতে কোনও অংশে সঠিক অবস্থানে নয়। ( ' বিধবা রতিমঞ্জরী', ’কলঙ্কিত সম্পর্ক ', 'চন্দ্রসূর্য যতদিন')।
৷ তাঁর গল্পের স্তরে স্তরে জড়িয়ে আছে ব্যাধিগ্রস্ততা এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর সৃষ্ট পুরুষ চরিত্রের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। নারীজীবনের অসহায়তা লেখককে ভাবিয়েছে,  লেখককে স্বস্তি দেয়নি, তাই তাঁর সৃষ্ট নারীরা পুরুষের পাশব কামপ্রবৃত্তিরর সাথেই পরিচিত হয়েছে শুধু, তাঁদের ভালবাসার কোমল স্পর্শ কোথাও খুঁজে পায়নি। এরই প্রেক্ষিতে তাদের মনোলোক এক নতুন মাত্রা পেয়েছে, তারা নতুনভাবে ভাবে আর পাঠককে ভাবায়। এখানেই তাঁর গল্পে আজকের যুগের পাঠক এমন কিছু খুঁজে পান যা আজকের জটিল জীবনাবর্তের সঙ্গে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। 
৷ "বিধবা রতিমঞ্জরী " গল্পটির শুরু এইভাবে -" রতিমঞ্জরী শেষ পর্যন্ত বিধবা হবেই, কারণ স্বামীকে যে রোগে ধরেছে- তার শক্তি যেমন প্রচুর, তেমনি দুর্নিবার এবং ওদিকে স্বামীর রক্তকণিকায় আর স্নায়ুতে বিদ্যুৎগর্ভ যে দুরন্ত তেজ বেরোবার কথাই নয়, যে তেজ শম্বুকগতি রোগের এই শোকের পলে পলে জীবনক্ষয়ের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং অক্ষয় মরবে এবং রতিমঞ্জরী বিধবা হবে। ভরসা দিলেন অর্বাচীন কেউ নয়, চিকিৎসকেরা।"
এই-ই লেখকের কথনভঙ্গির নিজস্বতা। যদি লক্ষ করি "ভরসা" শব্দটির অমোঘ প্রয়োগ, তাহলে দেখা যাবে এই একটি শব্দের ব্যঞ্জনা আমাদের অনেক কথাই বলে দিচ্ছে। মৃত্যুর "নিদান " আসে চিকিৎসকের তরফ থেকে "ভরসা" নয়। শব্দটি ব্যঞ্জনার্থে পাঠককে বুঝিয়ে দেয়, রতিমঞ্জরী আসলে স্বামীর হাত থেকে মুক্তি চাইছে। 
৷ জীবনের অন্তিম পর্যায়ে অক্ষয় স্ত্রীকে কাছে ডাকে, রতি আসে। অক্ষয় প্রশ্ন করে, "তুমি তো আমার ডাকে ব্যস্ত হয়ে ছুটে এলে না রতি।" রতি তা আসেনি, তাই অসংকোচে বলে, "তাই তো এলাম।" মৃত্যুপথযাত্রী অক্ষয় স্ত্রীকে বলে," তুমি আমার মুখের দিকে চেয়ে এখানে বসো-আমি তোমার মুখের সুধা পান করি।" 
একথা শুনে রতির হাসি পায়, যদিও হাসিকে সে ফুটিয়ে তোলে না। সে জানে, অক্ষয়ের নারীর মুখের সুধা পান করার তৃষ্ণা প্রবল,  এতই প্রবল যে তার মৃত সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছিল বলে অক্ষয় আনন্দের উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে না পেরে পুলকোচ্ছাস স্ত্রীকে ব্যক্ত করে ফেলেছিল, অব্যাহত সুধাপানের পুলক। সেই অক্ষয়ের চিতাগ্নির ধোঁয়া  যখন শূন্যমার্গে কুন্ডলায়িত হয়ে উপরিস্তরকে ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে তুলল, অগ্নিশিখা যখন বাতাসকে কম্পিত করে এক মরীচিকার সৃষ্টি করল, রতির মনে হলো মৃত্যুর পর চিতাগ্নির এই মরীচিকা অনেক বেশি নির্লিপ্ত ও নির্দোষ, বাস্তবের মরীচিকার চাইতেও, বাস্তবের মরীচিকার মিথ্যা প্রতারণা এতে নেই। 
৷ শয়নকক্ষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রতির মনে হলো বৈধব্যের এই রূপ যেন তাকে নতুন করে জন্ম দিয়েছে। এতদিন তাকে ঘিরে ছিলো  যে সৌভাগ্যের শৃঙ্খল, সেই শৃঙ্খল খসে পড়ায় ফুটে উঠেছে রতিমঞ্জরীর নূতনতর রূপ, এও যেন মন্দ নয়। রতির ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে একচিলতে হাসি, ঠিক এমনি সময়ে ঘরে ঢোকে রতির ছোটবোন মনোমঞ্জরী। সদ্য বিধবা রতির এই হাসি মনোর চোখ এড়িয়ে যায় না। হাসিটি আঘাত করে তাকে তার চিরাচরিত সংস্কারবোধে। সে ভাবতে পারে না কী করে তার দিদি এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে হাসতে পারে! 
৷৷ অক্ষয়ের বহুনারী চর্চিত জীবনের ভার রতি যেন ভারাক্রান্ত গর্দভের মত বহন করছিল। তার মনে হয় ঐ লোকটার সাথে বিবাহের পর থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর বৈধব্য। এখন সে সেই বৈধব্য থেকে ভারমুক্ত হয়েছে। লেখকের এই সময় থেকে অনেকটা অগ্রসর চিন্তা হয়তো সেভাবে  পাঠকেরা মেনে নিতে পারেননি।  আমাদের সমাজশাসিত যাপনের জগদ্দল সংস্কার অন্তত এইকথাই বলে। 
৷  রতি বিবাহিত জীবন চেয়েছিল, চেয়েছিল যথার্থ জীবনসঙ্গী, যেখানে পাবে সে সঠিক স্ত্রীর মর্যাদা। কিন্তু তা পায় নি সে, তার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। 
৷ এখন অক্ষয়ের মৃত্যুর পর ছাব্বিশ বছরের রতিমঞ্জরীর মন ধর্মের উদ্দেশ্যে চালিত করার উদ্দেশ্যে বোন, পাড়াপ্রতিবেশি, কারোরই ভাবনার আর অন্ত নেই, রামায়ণ পাঠ করে তাকে শোনানো হচ্ছে, রতি অবশ্য এতে কোনও বাধা দেয়নি, তার বৈধব্যবেশও ত্যাগ করেনি, বরং ব্যবহারে তাকে পাওয়া গেছে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। 
বিপত্নীক পুরুষ ও বিধবা উভয়ের মধ্যে যে সামাজিক অবস্থানগত বিষম পার্থক্য রয়েছে লেখক তা সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে বারংবার বোঝাতে চেয়েছেন-
"পুরুষ বিপত্নীক হলে তাকে বিপত্নীক সেজে থাকতে হবে, এমন কোনো প্রথা নাই, নারী বিধবা হলে তার বিধবা সাজবার একটা তোড়জোড়ই দেখা যায়, পথেঘাটে বিপত্নীক পুরুষকে দেখে মহিমান্বিত ত্যাগের নিদর্শনে বুঝবার উপায় নাই যে লোকটির স্ত্রী নাই.. নারী আর পুরুষের এই যে পার্থক্য, একজনের পক্ষে নেহাৎ হেলাফেলা, এর ভিতর পরাধীনতার বন্ধন আর স্বাধীনতার হামখোদাই খেয়াল আছে, আর আছে অভদ্র একটি ইঙ্গিত।"
এই বদ্ধমূল সামাজিক সংস্কারের মূলে কুঠারাঘাত করেছে চল্লিশের দশকের রতিমঞ্জরী দাসী। সবাই ঈশ্বরের দিকে মনোসংযোগ করতে অনুরোধ করেছে রতিকে, মানুষকে আহ্বান করতে কেউ বলছে না। অক্ষয় নামের ব্যক্তিটিকে সমাজ তার জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে স্বামী পরিচয়ে, অথচ যাকে সে যথার্থ স্বামী হিসেবে পায়নি, সেই ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাকে স্বতই বলা হচ্ছে ব্রহ্মচর্য পালন করো। কী অদ্ভুত আর অন্যায় এই সমাজের নির্দেশ।  রতির মনে হয় -
৷  " সবাই বলছে, দেবতাকে ডাকো, দেবতাকে জানো, দেবতাকে ভালবাসো, দেবতাকে ঘরে আনো, দেবকাহিনি বলো আর শ্রবণ করো। মানুষকে ডাকতে কেউ বলছে না।.... কিন্তু মানুষের মতো অপরূপ আর মনোহর কোন দেবতা! কোনো দেবতার মূর্তিকে মানুষের মূর্তির মতো অন্তরে প্লাবিত হয়ে সুশ্রী হতে কেউ দেখে নাই। সুগঠিত আর মর্মবান আর অন্তরচারী মর্মবিদ মানুষ যে হয় আর যদি আত্মদানের উন্মুখতা হৃদয়ঙ্গম করে সে আহ্বানে সাড়া দেয়, তবে তার মতো শান্তিপ্রদ আর কোন দেবতা হতে পারেন!.... দেবতার রূপান্তর নাই, ভাবাবেগ নাই, আবেশ নাই, আগ্রহ নাই - দেবতা দিতে পারেন সীমাবদ্ধতা, বন্দীত্ব আর অচেতন মগ্ন জীবন,  কেবল মানুষই দিতে পারে সাড়া পাওয়ার সজীব আনন্দ। দেবতা একঘেয়ে নিজেই নিষ্প্রাণ। " 
রতি তাই সমস্ত সংস্কারের নিগড় ভেঙে খোলাখুলি বিদ্রোহ করে। কাগজে বিবাহের জন্যে বিজ্ঞাপন দেয়। সে অন্তর থেকে চেয়েছিল, অথচ পায়নি তাকেই পুনরুদ্ধারের আশায় তার এই নবীন প্রচেষ্টা। স্বাভাবিকভাবেই  বিজ্ঞাপনটি সাড়া তুলে চারদিকে, বিচিত্র ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ হয় এই রতিমঞ্জরী দাসী সম্বন্ধে।  তার বাহ্যিক রূপ, সামাজিক অবস্থান সম্বন্ধে চলতে থাকে সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম আলোচনা। তাই রতির বিজ্ঞাপনের উত্তরে প্রথমেই আসে গালাগালি দেওয়া কুৎসিত চিঠি।  এদিকে ছোটবোন মনোমঞ্জরী আসে রতিমঞ্জরীকে দুয়ো দিতে। চিঠি ও ছোটবোনের অভিমত কিন্তু খুব সহজভাবেই গ্রহণ করে রতিমঞ্জরী কারণ এই সমাজ ও তার প্রতিটি তন্তুজালে আটকে থাকা মেয়েদের সে চেনে। এরকমটি যে হবে তা যেন রতির জানাই ছিল, সুতরাং এতে ক্ষুণ্ণ হবার কিছুই নেই।  
৷ এবার বিজ্ঞাপনের উত্তরে এগিয়ে যে আসে সে এক মৃতদার ব্যক্তি,  ঘরে তার গুটিকয়েক ছেলেমেয়ে আছে, তাদের দেখাশোনার জন্যে এবং নিজের প্রয়োজনেও স্ত্রীলোকের প্রয়োজন।  বছর চল্লিশের সেই মোহনবাবু সামান্য বেতনের চাকুরি করেন, অফিসের বড়বাবুর কাছ থেকে তিনি শিখেছেন কীভাবে সামান্য তথ্য থেকে ভিতরের খবরটিকে টেনে বের করে আনা যায়। তাই বিজ্ঞাপন থেকে মোহনবাবুর বিশ্লেষিত তথ্য এইরূপ - রতিমঞ্জরীর টাকা আছে, টাকা না থাকলে কেউ অহেতুক শত্রুসৃষ্টি করতে সাহস পায় না, পেটের দায়ে কোন বিধবা কদাপি বিয়ে করেছে বলে তিনি শোনেননি। সন্তানাদি যে বর্তমানে নেই এটা খুব সুবিধাজনক তার জন্যে।দেখতে নিশ্চয়ই ভালো নয়, কালো হয়তো,  মোটা, কিছুটা ট্যারাও হতে পারে। অত:পর বন্ধুবর্গের সাথে আলোচনার পরিসমাপ্তিতে সংক্ষিপ্তসার এই দাঁড়ায় স্বামী যখন রতিমঞ্জরীর ছিল নিশ্চয়ই সেখানে ভালোবাসা জন্মেছিল। সামাজিক সকল সংস্কারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যে আবার বিয়ে করতে চাইছে তার মানে এটা হতেই পারে স্বামী যখন তার বেঁচে ছিল তখনই নিশ্চয় ভালবাসা ফুরিয়ে গিয়েছিল, কেন তার কারণটা খুঁজতে যাওয়া অন্যায়, কেননা তিনি ভদ্রমহিলা।  মেয়েরাই পুরুষকে সংস্কারের বন্ধনে বেঁধে রাখে, সেই সংস্কারকে ছিন্ন করতে যে মেয়ে দ্বিধাবোধ করে না, তার কাজকে ঢাকঢোল পিটিয়ে তারিফ করা যায়, তবে অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করা যায় না।  
৷ রতিমঞ্জরী মোহনকে দেখেই চিনতে পারে। সমস্ত অনুভূতি মথিত করে সৃষ্টি হয় নিরবচ্ছিন্ন যন্ত্রণা এবং বেদনার।  সে বুঝতে পারে সমস্ত হৃদয়মথিত আহ্বানের দ্বারা যাকে সে টেনে এনেছে সে মানুষ নয়, কীট। সে আজ যাচাই করতে এসেছে তাকে পণ্য হিসেবে। 
লেখক আগেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন মোহনের। আরও সুস্পষ্ট পরিচয় করালেন রতির বৈঠকখানার দেওয়ালে একটি ছবি দেখে মোহনের মানসিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে।  ছবিটিতে একটি সাহেব এবং মেমসাহেবের মধ্যে কথা হচ্ছে, সাহেবের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে কোনও গুরুতর কথা সে মেমসাহেবকে বোঝাচ্ছে। মোহনের ছবিটি দেখে ভালো লাগল এবং সে তার ভালোলাগা ব্যক্ত করল এইভাবে - " বেটাছেলের মেয়েটাকে ফুসলে নিয়ে পালাবার চেষ্টা.... "
মোহনের মত মানুষ,  যে নিজের বৃত্তের বাইরের পৃথিবীকে জানে না বা জানবার আগ্রহও নেই, তার পক্ষে রতির বিধবার বেশ ধারণ করে ঘরে ঢোকার অর্থ বুঝতে পারে না। যে বিধবা বিবাহের জন্যে কাগজে বিজ্ঞাপন দেবার সাহস রাখে, তার ব্রহ্মচারিণীর বেশ ধারণ করার তাৎপর্য কি  ভেবে ভেবে থই পায় না মোহন। 
প্রশ্ন সে করার আগেই রতিমঞ্জরী প্রশ্নোত্তর পর্বের মুখ্য ভূমিকা নেয়।  অপরিসীম আক্রোশে রতির প্রশ্নাবলীতে মোহন ভয়, সংশয়, বিস্ময়, হতাশায় দোলায়িত হতে হতে শোনে - 
৷ " আপনার স্ত্রীকে খুব ভালবাসতেন? "
৷ " বিয়ে করে স্ত্রীকে দিয়ে  সুলভ গণিকাবৃত্তি করিয়েছেন? "
৷৷৷ " বিয়ে না করে রক্ষিতা রাখেননি কেন?  
মোহন বুঝতে পারে না রতিমঞ্জরী সমগ্র পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আঘাত করতে চাইছে। সে অপমানিত হয়ে ফিরে যায়। 
রতির জীবনে আসে না কোনো সজীব বসন্ত,  সুস্থ, মাধুর্যময় জীবনের হাতছানি। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ক্রুরতার যন্ত্রণায় নীল হয়ে রতি নিজের অতীত এবং বর্তমান জীবনের ঘটনাবলীকে পরপর সাজিয়ে ভাবে -
" ক্রুর দুরভিসন্ধি এবং নির্লজ্জ লাম্পট্য নিয়ে স্বামী তাকে চেয়েছিলেন এবং পেয়েছিলেন..... কিন্তু তিনি তাকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে গেছেন।....এই ব্যক্তি এসেছিল তারই দোসর হয়ে, পাপের দ্বিতীয় দূত হয়ে, তাকে দ্বিতীয়বার গণিকাবৃত্তিতে প্ররোচিত করতে..."
এই সমাজ রতিকে সুস্থ জীবন দিতে রাজি নয়, তার গণিকাবৃত্তিই সে চায়। সুতরাং সে গণিকাই হবে। পাড়াপ্রতিবেশি এইসব ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে রতিকে গণিকার আসনে বসিয়ে দিয়েছে, রতিও নিজেকে তাই ভাবে। এরপর শুরু হয় রতির কৃচ্ছসাধন। 
" একদা একটি লোক গণিকাগৃহ থেকে এসে তাকে গণিকা সাজিয়ে অশুচিতা দিয়ে গেছে, সেই অসহ্য অশুচিতা সে অবিরাম পরিত্যাগ করবার কৃচ্ছ্রব্রত পালন করছে...... "
"বিধবা রতিমঞ্জরী " গল্পটি প্রকাশিত হয় "প্রবর্তক " পত্রিকায় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে। সেই সময়ের নিরিখে জগদীশ গুপ্তের এই অগ্রসর ভাবনা এই পাঠককে আজও বিস্মিত করে। তাঁর মানবিক দৃষ্টিকোণ সংস্কারবর্জিত ও জগদ্দল পাথরের মত সমাজের বুকে চেপে থাকা অনমনীয় অপসংস্কারকে দেখার চোখ গল্পভাবনার চিরাচরিত ভিতটাকে নাড়িয়ে দেয়। 

#বিজয়া দেব। 


আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে

 আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও কিছু কথা

মানুষ স্বাধীনতা প্রেমী। কিন্তু দুর্ভাগ্য এটাই যে বারবার মানুষের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। সে স্বাধীনতা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, শিক্ষার ক্ষেত্রে এবং ভাষার ক্ষেত্রে।  মানুষ একবার দু'পা এগোয় আর তিনপা পেছোয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বিভাজন এবং আগ্রাসনের মনোভাব থেকে মুক্ত হতে না পারার শৃঙ্খল তাকে পিছিয়ে দিতে বাধ্য করে।

বর্তমান বাংলাদেশের  টলোমলো রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিচারে ২০২৫ এর মাতৃভাষা দিবস নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না। চলে যাচ্ছি পেছনে, সেই ১৯৫২ এর ভাষিক স্বাধীনতা আন্দোলনের দিনগুলোতে।  

আমরা ৭১ এর যুদ্ধ দেখেছি, বরাক উপত্যকার ১৯ শে মে-র ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানি, ১৯৫২ এর ইতিহাস জানি।  বরাক উপত্যকায় দেখেছি উনিশ ও একুশের আত্মীকরণ। কারণ দুটি আন্দোলনের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একই আগ্রাসনের মনোবৃত্তি, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ।

১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো প্রথম বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিয়ে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" হিসেবে ঘোষণা করে।  প্রতিটি জাতি ও গোষ্ঠীর মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব দেওয়া ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র রক্ষায় এই গুরুত্বপূর্ণ ও মানবসভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে এই মহতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ইউনেস্কো পৃথিবীর ইতিহাসে অনবদ্য ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সাল, সারা বিশ্ব জুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়। সেখানে মাতৃভাষা স্বাধীনতার জন্যে এবং মুমুর্ষু ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে মানুষের চেতনাবৃদ্ধির বিষয়টিতে আলোকপাত করা হয়। ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষায় বিভিন্ন ভাষাশিক্ষা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র রক্ষার দিকটিকেও গুরুত্ব আরোপ করা হয়। 

উনিশ কিম্বা একুশ ভাষাদিবসের এই দুটো দিনের সাথে যে ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে তা হলো দেশভাগের ইতিহাস।  দেশভাগের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মারাত্মক ভুলের বোঝা বহন করে চলেছে আজও আমাদের দেশ ভারত ও আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশ।  "বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান " এই বাণী কেউ গ্রহণ করেনি, একে নস্যাৎ করে দিয়ে ১৯৪৭ এ ভারতের পুব ও পশ্চিমের ভূখণ্ড থেকে ১৬০০ কিলোমিটার অংশ কেটে দিয়ে স্বাধীনতার সূর্য উঠল।  দেশভাগ হলো পুব ও পশ্চিমের ভূখণ্ডে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে। কোন স্বার্থে তা হয়েছিল কেনই বা বিভাজনের নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হলো তা যথার্থই গবেষণার বিষয় আজও। সেই গবেষণা অব্যাহত থাকার কাজ জারি থাক আজও, এবং তা জরুরি বলেই মনে করি। 

দেশভাগের ফলস্বরূপ হাজার হাজার মানুষ ছিন্নভিন্ন ও ছিন্নমূল হলো। শরণার্থী শিবির, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ,  মৃত্যু,  নারীধর্ষণ ও নিখোঁজ হলো অজস্র মানুষ। হাহাকারে ভরে উঠল দেশ। তারপরও সমস্যা ক্রমশ আরও গভীর ও গুরুতর হয়ে উঠতে লাগল। যে কারণে দেশভাগ হলো তার সমস্যা আজও মেটেনি এবং কস্মিনকালেও মিটবে বলেও মনে হচ্ছে না এবং পরিস্থিতি আরও জটিল ও ঘোলাটে হয়ে উঠছে। আপাতসময় সেই দেশভাগই তার তর্জনি নির্দেশে পেছনের  পথটাই দেখাচ্ছে।

ভারতের পূর্বপ্রান্তের কিছু অংশ ও পশ্চিমপ্রান্তের কিছু অংশ নিয়ে ধর্মের নিরিখে গঠিত হলো নতুন দেশ "পাকিস্তান "। পুব পাকিস্তানের মুখের ভাষা বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের মুখের ভাষা উর্দু।  এতে কোনও সমস্যা ছিল না। যে যার মাতৃভাষায় কথা বলবে সেটাই তো স্বাভাবিক। তথ্যসূত্র বলে, পুব পাকিস্তানের লোকসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বেশি হওয়া সত্ত্বেও এবং জাতীয় অর্থনীতিতে পুব পাকিস্তানের দেয় পরিমাণ ভালো মাত্রায় হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানের হাতেই রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত হচ্ছিল এবং পুব পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবেও বঞ্চিত হচ্ছিল যদিও পুব পাকিস্তান থেকে পাটের রপ্তানি খুব ভালোভাবেই হতো। পুব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে একটা অন্তর্লীন বিরোধিতা ও অসন্তোষ ক্রমেই দানা বাঁধছিল। এই অসন্তোষ প্রবল হয়ে ওঠে  যখন পশ্চিম পাকিস্তান উর্দু ভাষাকে পুব পাকিস্তানের ওপর একমাত্র  সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়। পুব পাকিস্তানের মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে  শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্র জনতা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে, পুলিশ গুলি ছুঁড়তে শুরু করে, প্রথমেই গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ে রফিক। রফিকউদ্দিন আহমেদ। রফিক ছিলেন তখনকার ঢাকার জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। ইনি বাহান্নর প্রথম ভাষা শহিদ। একে একে শহিদ হন আবুল বরকত, শফিউর রহমান, আবদুস সালাম, আবদুল জব্বার।  মাতৃভাষা সুরক্ষায় এদের প্রাণ বলিদান ইতিহাসের বুকে গৌরবোজ্জ্বল স্থান করে নিয়েছে। 

অতি সম্প্রতি "আমি বাংলায় গান গাই, আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই" এই অনবদ্য গানটির স্রষ্টা শ্রদ্ধেয় প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের অমর একুশের প্রাকমুহূর্তে প্রয়াণ যেন অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল। এ যেন কিসের সংকেতবাহী। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা মাতৃভাষা সুরক্ষায় বুকের বল বাড়াতো। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন সত্যিই বাংলাভাষার সুরক্ষার দিকটি নিয়ে একটি  প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছে। বিভাজনের উগ্র মনোবৃত্তি  দ্রুত পরিস্থিতি বদলে দিচ্ছে। সুতরাং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের দিনে এই প্রশ্নচিহ্নগুলো অবশ্যই উঠে আসবে -

১. বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য কতটুকু সুরক্ষিত আজ বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে।

২. বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার সংখ্যা প্রায় ৭০০০ এর কিছুটা বেশি, তার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে মুমুর্ষু অবস্থায় রয়েছে, বাংলা ভাষা কি ধীরে ঐ দিকে এগোচ্ছে?

এইসব প্রশ্নের বিবেচনায় ২০২৫ এর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের জন্যে ইউনেস্কো বিশেষ বিষয় নিয়েছে - " Make language count for sustainable  development ". ইউনেস্কো ফেব্রুয়ারি ২০ ও ২১ শে হেডকোয়ার্টার প্যারিসে এই বিষয়ের আলোকে  আলোচনা চক্রের আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রজতজয়ন্তী পালন করছে। এখানে মুখের ভাষা সুরক্ষিত রাখা ও তার উন্নয়নের ওপর আলোকপাত করা হবে।

আমাদের বাংলায় এবং অমর উনিশের বরাক উপত্যকায় অমর একুশে হয়তো এবারও পালন করা হবে, কিন্তু সেই আবেগিক পথযাত্রা কতটুকু অব্যাহত থাকবে সেটাও একটা প্রশ্ন। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি সাপেক্ষে এবং সেই আনুষ্ঠানিকতা ছাড়িয়ে উঠছে যে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢাকা দিশাহীন পথ, সেখানে কি আলোর পথযাত্রী কেউ কি জেগে থাকবে?

 #বিজয়া দেব।



বরাকের ভাষাসংগ্রামের কবিতা

 "বরাকের ভাষা- সংগ্রামের কবিতা দ্বিভাষিক সংকলন  ( Poems on The Language Movement In Barak Valley, A bi-lingual Anthology) " -এক সংক্ষিপ্ত  আলোকপাত



এক স্বতন্ত্র প্রবাহ বরাক উপত্যকার উনিশের কবিতা। তাই বরাক উপত্যকার কবিতার ধারা পশ্চিমবঙ্গের কবিতার ধারা থেকে বিশেষভাবে আলাদা।  উনিশের চেতনা অজস্র বাংলা কবিতার জন্ম দিয়েছে, বাংলা ভাষা ও কবিতা চর্চার ক্ষেত্রে বরাক উপত্যকার এই কবিতা মাতৃভাষা চেতনার উজ্জীবনের ইতিহাসে বিশেষ মাত্রার সংযোজন। বাংলা ভাষাও সংস্কৃতির অস্তিত্বরক্ষার ইতিহাসে তাই উনিশে মে বিশেষ দিশার চিহ্নসূত্র।

Shakespeare Society of Eastern India, Silchar Chapter and Writer's Co-operative, Kolkata থেকে শ্রদ্ধেয় সুবীর কর, দীপঙ্কর পুরকায়স্থ, দীপঙ্কর কর, অমিতাভ রায়, দেবনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় , দেবাশীষ চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনা ও তপু বিশ্বাসের সহযোগী সম্পাদনায় এক দ্বিভাষিক কবিতা সংকলন "বরাকের ভাষা সংগ্রামের কবিতা বা Poems on The Language Movement In Barak Valley প্রকাশিত হয় উনিশে মে, ২০০২ সালে বরাক উপত্যকার একগুচ্ছ কবির ভাষা দিবসের কবিতা নিয়ে, এইটি মূলত ভাষা দিবসের ওপর লেখা বাংলা কবিতার ইংরেজি অনুবাদ সংকলন। এই ধরনের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ করা হয়েছে ২৪ বছর আগে, নিশ্চয়ই  বাংলা ভাষাচেতনার কবিতাকে দিকে দিকে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে, বৃহত্তর পরিসরে কবিতাপাঠকের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে। 

সংকলনের কাজটি করা হয়েছে সুচারুভাবে, ৭০ পৃষ্ঠার একটি কবিতা পুস্তক, নিগূঢ় কালো প্রচ্ছদ, উজ্জ্বল তমসার বুকে সাদা অক্ষরের লেখা বইয়ের নাম ও সম্পাদকমণ্ডলীর নাম অন্ধকার আকাশের বুকে যেন দীপ্যমান নক্ষত্রমালা।

সব কবিই বরাক উপত্যকার এবং অনুবাদ করেছেন যাঁরা তাঁরাও এই শহিদ ভূমির,  কেউ কেউ প্রখ্যাত কবি ও নামী ব্যক্তিত্ব। যেহেতু ভাষা আন্দোলনের আবেগের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে প্রতিটি কবিতা, তাই অনুবাদ করার ব্যাপারটিও বেশ দুরূহ। তবু মাতৃভাষা চেতনার এই কবিতাগুলো বৃহত্তর কবিতা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে এই ধরনের প্রয়াস নেওয়ার কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করার সংকল্প নেওয়া হয়েছে প্রকাশনার পক্ষ থেকে, Preface এ বলা হয়েছে -" This anthology of poems on the struggle for a distinct and untainted cultural identity, written by poets of this valley, and their English translation is a pioneering attempt to make available to a wider range of readers.... ", বাংলা প্রাককথনে বলা হয়েছে, ".. অধিকাংশ কবিতার মূল রয়েছে একটি নির্ধারিত, অমোঘ আবেগ সংশ্লেষের মধ্যে। ফলে অনুবাদকর্ম যথেষ্ট জটিল হয়ে পড়েছে। Source Language এবং Target Language এর সমন্বয় মাঝে মাঝে খুব দুরূহ মনে হয়েছে। কিন্তু অনুবাদক কাজটি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে করেছেন। "

যাঁদের কবিতা সংকলিত হয়েছিল তাঁদের মধ্যে অনেকেই আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু মাতৃভাষা রক্ষার জন্যে তাঁদের কবিতা উনিশের চেতনার এক ঐতিহাসিক স্বাক্ষর। বইটির প্রচার ও প্রসার কতখানি হয়েছে তা জানা নেই। যাঁদের কবিতা এই সংকলনটিতে স্থান পেয়েছে - বিশিষ্ট কবি ছবি গুপ্তা, দেবেন্দ্রকুমার পালচৌধুরী, জন্মজিৎ রায়, অতীন দাস, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, চন্দ্রিমা দত্ত, চামেলী কর, পার্থপ্রতিম মৈত্র, দিগ্বিজয় পাল, হীরেন্দ্র কুমার গুপ্ত, ভাস্করজ্যোতি দেব, দিলীপকান্তি লস্কর, দীপঙ্কর নাথ, জিতেন্দ্র নাগ, স্বর্ণালী বিশ্বাস, বিজয় কুমার ভট্টাচার্য,  সুধীর সেন, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী,  অমিতাভ দেব চৌধুরী,  সুবীর কর, শেলী দাস চৌধুরী, আশীষ রঞ্জন নাথ, করুণা রঞ্জন ভট্টাচার্য, মৃদুলা ভট্টাচার্য,  ব্রজেন্দ্র কুমার সিংহ, তপোধীর ভট্টাচার্য,  স্মৃতি পাল, আবুল হোসেন মজুমদার, অনুরূপা বিশ্বাস, সুজিত দাস, লুৎফা আরা চৌধুরী, বিজিৎ কুমার ভট্টাচার্য,  মলয় কান্তি দে, রামেন্দ্র দেশমুখ্য, তুষার কান্তি নাথ, সঞ্জীব কুমার দাস, জালাল উদ্দিন লশকর, পীযূষ কান্তি দাস, দিদারুল ইসলাম। এখানে যাঁদের কবিতা সংকলিত হয়েছে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ অনুবাদক হিসেবেও রয়েছেন,  এছাড়া যাঁরা অনুবাদ করেছেন Sukalpa Bhattacharjee,  Dipankar Purkayastha,  Dipankar Kar, Jahar Kanti Sen, Jyotilal Chowdhury, Dipankar Purkayastha।

  কবি জিতেন্দ্র নাগের ( কবি জিতেন নাগ)  একটি কবিতা থেকে চারটি পংক্তি উদ্ধৃত করছি, কবিতাটির নাম "গণতন্ত্র"  - " তার দিন কলরবে/ আত্মক্ষয়ে রাত।/বুকের চৌহদ্দি জুড়ে হাওয়া উতরোল/ ক্লান্ত হাতে হাপর টানছে রসময়- / বর্ণমালার প্রেমে ভাই তার শহিদ হয়েছে।.. " কবিতাটি অনুবাদ করেছেন বরাক উপত্যকার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব Jyotilal Chowdhury। "  Democracy " - " His days spent in confused uproar /And the nights in anguish / Rasamay begins his hard and hectic day/ The restless breeze soothes his heart, heavy/ With ceaseless work. /His long - weary hands lay / Pensive but proud of his brother's martyrdom/ For the right to language and freedom..... "।  

আরেকটি কবিতা তুলে ধরছি।  স্বর্ণালী বিশ্বাসের "একুশ আমার উনিশ আমার " - " হাজারটা দিন / হাজারটা রাত, বাঁচাতে বাঁচাতে /মরে গেলাম,/ নিজের সুখের এবং দুখের / সপ্তকাহন গেয়ে গেলাম-/ তোমরা যারা বুক পেতেছো / হাড় দিয়েছো বজ্রগড়ার / একুশ আমার, উনিশ আমার,/ আজকে সেলাম।/ আজকে সেলাম। / আমি মাকে চিনি, বাপকে চিনি/ নিজের বুকের শব্দ শুনি/ তোমরা যারা জিভ দিয়েছো/ স্বর দিয়েছো কথা বলার,/ সেই ভাষারই কবচ পরে / যুঝতে এলাম, বাঁচতে এলাম/ একুশ আমার, উনিশ আমার,/ আজকে সেলাম। / আজকে সেলাম। ... "। কবিতাটির অনুবাদ করেছেন Sukalpa Bhattacharjee -" A thousand days and nighis of life/ I lived, like death/ Singing ballads of my own/ Joys and miseries./ You who laid down your life/ for us,/Gave us weapons of / Your blood and bone/Hail 19th May, / Hail 21st February, / Hail Martyars! / I know my mother,/ I know my Father, /I hear the sound of language of my heart. / You who gave us our language / of my heart. / You who gave us our tongue / Our own voice to speak / I chant the mantra of / my language / To face, to fight and/ dare to live a life/ Hail 19th May,/Hail 21 st February, / Hail Martyrs! "

বরাকের ভাষা সংগ্রামের ওপর সৃষ্ট কবিতার এই বিশেষ দিকটির ওপর এই সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করতে গিয়ে মনে হলো যেন প্রতিটি কবিতার ভেতরের এই আদিগন্ত প্রসারণ  বরাক উপত্যকার চারপাশের দেয়াল ভেঙে আবিশ্ব জুড়ে তার বার্তাকে ছড়িয়ে দিচ্ছে, কিন্তু আবার নিজের কাছেই ফিরে এসে রবীন্দ্রনাথের  ভাষায় সেই অমোঘ শূন্যতাকেই প্রশ্ন করি - "কী আছে শেষে,  পথের?"   

......................................................

#বিজয়া দেব।

৩রা মে, কলকাতা - ৭৮



দ্রৌপদী -এক বহুস্বরীয় কণ্ঠস্বর

দ্রৌপদী’-এক বহুস্বরীয় কণ্ঠস্বর

‘দ্রৌপদী’ গল্পটির শুরুতেই পরিচয় পেয়ে যাই দ্রৌপদীর-‘নাম দ্রৌপদী মেঝেন, বয়স সাতাশ, স্বামী দুলন মাঝি(নিহত), নিবাস চেরাখান, থানা বাঁকড়াঝাড়, কাঁধে ক্ষতচিহ্ন(দোপদি গুলি খেয়েছিল, জীবিত বা মৃত সন্ধান দিতে পারলে এবং জীবিত হলে গ্রেপ্তারে সহায়তায় একশত টাকা...’কেন দ্রৌপদীকে গ্রেপ্তার হতে হবে?আদিবাসী মহিলাটি তকমাধারীর ভাষায়-‘মোস্ট নটোরিয়াস মেয়েছেলে। লং ওয়ান্টেড ইন মেনি...’কেন ‘নটোরিয়াস’? দুলন ও দ্রৌপদী মানে দোপদি মেঝেন ‘নিয়নডারথাল’ অন্ধকারে নিখোঁজ থাকে, আত্মগুপ্তিতে তাদের অসাধারণ দক্ষতা, লাশের মাঝখানে এরা নিহতের ভান করে পড়ে থাকতে জানে। উনিশশো একাত্তর সালে বিখ্যাত অপারেশন বাকুলিতে যখন তিনটি গ্রাম কর্ডন করে মেশিনগান করা হয় তখন দুলন ও দোপদি লাশের মাঝখানে নিহতের ভান করে পড়েছিল। প্রভাতে লাশ গুনতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সন্ধান না পেয়ে ক্যাপ্টেন অর্জন সিং এর ‘ব্লাড সুগার’ বেড়ে যায়। তকমাধারী সভ্যতার কাছে আদিবাসী সমাজ ও সংস্কৃতি, তাদের অনাদর, ক্ষুধা, ঘুরে দাঁড়ানোর সাহসী উদ্যম খুবই চিন্তার বিষয়। যে আদিবাসীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবী, যে মেকি সভ্যতাকে উপেক্ষায় বর্জন করেছিলেন, সেই আদিবাসী সমাজের দুলন-দোপদি ‘অপিসার’দের কাছে ‘এনিমি’ এবং এদের ধ্বংস করা খুবই জটিলতর প্রক্রিয়া। সুতরাং দুর্ভেদ্য ঝাড়খানি জঙ্গল তন্নতন্ন করে খোঁজে আর্মিরা আর চ্যাটাল পাথরে উপুড় হয়ে শুয়ে জল খাচ্ছিল যে সাঁওতাল যুবক তাকে গুলিবিদ্ধ করা হয়। ৩০৩নং এর আঘাতে ছিটকে পড়ে যেতে যেতে সে ভীষণ গর্জন করে ‘মা হো’। তারপর রক্তাক্ত হয়ে নিশ্চল হয়ে পড়ে। পরে বোঝা যায় সে-ই মোস্ট ওয়ান্টেড দুলন মাঝি-দোপদি মেঝেনের স্বামী। এরপর দোপদির খোঁজ। দোপদি পেটকাপড়ে ভাত নিয়ে যায় কমরেডদের জন্যে। মুসাই টুডুর বউ ভাত রেঁধে দেয়। কেউ দোপদি নামে ডাকে, দোপদি সাড়া দেয় না। এখানে তার নাম উপী মেঝেন। পঞ্চায়েত অফিসে সে দেখে এসেছে কাগজে তার নাম রয়েছে, যে তাকে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে দু’শ টাকা বখশিস দেওয়া হবে।রাস্তায় ধরা পড়ে যায় দোপদি। সেনানায়কের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। একঘন্টা জেরা করা হয়। তারপর সারারাত ধরে চলে লাগাতার ধর্ষণ। প্রায় অচেতন দ্রৌপদীর যখন চেতনা ফেরে তখন সে বুঝতে পারে তার যোনিদ্বারে চটচটে রক্ত, হচ্ছে রক্তস্রাব। কতজন তাকে ধর্ষণ করেছে...চার, পাঁচ, ছয়, সাত। সকালবেলায় হুকুম আসে বড় সাহেবের তাঁবু থেকে, দ্রৌপদীকে নিয়ে যাবার জন্যে। সান্ত্রী তাকে কাপড় পরাতে আসে কিন্তু দ্রৌপদী কাপড় পরে না। উলঙ্গ রক্তাক্ত দ্রৌপদী সেনাপ্রধানের সামনে এসে দাঁড়ায়। বিক্ষত তার স্তন, যোনিকেশে রক্ত, সেনানায়কের সামনে দাঁড়িয়ে দুর্বোধ্য হাসে। সেনানায়ক এই ভয়ানক মূর্তি দেখে সন্ত্রস্ত-কাপড় কোথায়? কাপড়?আর দ্রৌপদী যেভাবে সাথিদের জানান দেবার ‘কুলকুলি’ দিত তেমনি তীব্র তীক্ষ্ণ সুরে বলে- ‘ কাপড় কি হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু?’ তার রক্তমাখা থুতু সেনানায়কের সাদা বুশশার্টকে বেছে নেয়।‘দ্রৌপদী’ গল্পের স্রষ্টা মহাশ্বেতা দেবী আদিবাসী জীবন ও আরণ্যক জীবনস্রোতের সাথে ব্যক্তিগতভাবে জড়িত ছিলেন। কলকাতায় থেকেও মহানাগরিক জীবনস্রোত তার কাছে তেমন করে ধরা দেয়নি। প্রান্তিক জীবনচর্যা, তাদের বৈপ্লবিক চেতনার সাথে তার নৈকট্য দেশীয় মানুষের সার্বিক মুক্তির যেমন সন্ধান করেছে তেমনি মুখোশধারী মহানাগরিক জীবনের কৃত্রিমতাকে বর্জন করেছে। তাঁর পড়াশোনার ক্ষেত্রটিও ছিল স্বত্রন্ত্র ধারার। যা নিয়ে কাজ করতেন তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়পাঠে তাঁর আগ্রহ ছিল। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন-‘...আমি বহুদিন যাবতই পশিমবঙ্গের কথাসাহিত্য পড়ে উঠতে পারি না। কেননা আমার অত পড়া হয় না। যখন যেটুকু সুযোগ হয় পড়ি। হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আমাদের দেশে জনপ্রিয় লেখক। ওদের লেখা পড়েছি।...তবে আমি সবসময় যে ধরনের লেখা পড়ি তা হচ্ছে জরিপ, সরকারি আইন, পরিসংখ্যান ইত্যাদি। এগুলো নিয়ে কাজ করতে ভালবাসি। এগুলো নিয়েই অধিকাংশ সময় চলে যায়।’ (১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে মারুফ রায়হান কর্তৃক গৃহীত মহাশ্বেতা দেবীর সাক্ষাৎকার)‘দ্রৌপদী’ গল্পপাঠে তাই আমরা এক স্বত্রন্ত্র ঘরানার লেখিকাকে পেয়ে যাই। মনে হয়, লেখিকার লেখক হয়ে ওঠাই উদ্দেশ্য ছিল না, লেখাকে তিনি কাজে লাগিয়েছেন প্রান্তিক ভারতবর্ষের সমাজকর্মী হিসেবেই। দ্রৌপদী গল্পের ভাষ্যলিপিতে, প্রকরণকৌশলে সেই লেখিকাই পাঠকের কাছাকাছি চলে আসেন যিনি বাস্তবতা ও নান্দনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন একজন সমাজকর্মীর দৃষ্টিকোণ থেকেই।‘দ্রৌপদী’ গল্পের শেষার্ধে এসে চমকে উঠি যখন দেখি ধর্ষিতা দ্রৌপদী ধর্ষক সভ্যতার কাছে নগ্নরূপে ধরা দেয়। প্রখর সূর্যালোকে রক্তাক্ষরের অনুপুঙ্খে আঁকা হয় দ্রৌপদীর নগ্ন অবয়ব। ভাষা হয়ে ওঠে চাঁছাছোলা তলোয়ার-ধর্ষক সভ্যতার বুকে প্রতিটি অক্ষর যেন কেটে কেটে বসে সেনানায়কের সাদা বুশশার্টে ঘৃণার রক্তমাখা থুতু ছড়িয়ে দেয়। প্রতিপক্ষের ভীতির আঁচটুকু যেমন ছড়িয়ে পড়েছে গোটা গল্পে তেমনি শিহরিত হয়ে উঠি যখন দেখি দ্রৌপদী বলে-‘হেথা কেউ পুরুষ নাই যে লাজ করব, কাপড় মোরে পরাতে দিব না আর। কি করবি? লেঃ কাঁউটার কর লেঃ কাঁউটার কর...নারীমুক্তির আন্দোলনকে লেখিকা শোষণমুক্তির আন্দোলন থেকে কখনো আলাদা করে দেখেননি। শোষণমুক্ত সমাজে নারীপুরুষ নির্বিশেষে মানুষের সার্বিক মুক্তি সম্ভব তাই বিশ্বাস করেছেন। তবু একথা বলতেই হয় দোপদি মেঝেনের প্রতিবাদ, রুখে দাঁড়ানোর স্বাতন্ত্র নারীর প্রতিরোধশক্তিতে ভিন্নতর ভাষা জুগিয়েছে। দোপদি মেঝেন কি একাই দ্রৌপদী? এই সময়ে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বলতেই পারি নারীর ভূমিকা এ সমাজে যৌনতার নগ্ন স্তরেই আটকে আছে। এখানে সব নারীই দ্রৌপদী। দ্রৌপদীর এই প্রতিবাদ তাই আমাদের আমূল নাড়া দিয়ে যায়। প্রতিরোধী শক্তির পেছনে কোনও কৃত্রিমতা নয়, শুদ্ধ মানবিক স্বরটি শুনতে পাই আর নতুন করে ভাবতে বসি।

# বিজয়া দেব।