Thursday, 5 November 2026

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে

 আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও কিছু কথা

মানুষ স্বাধীনতা প্রেমী। কিন্তু দুর্ভাগ্য এটাই যে বারবার মানুষের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। সে স্বাধীনতা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, শিক্ষার ক্ষেত্রে এবং ভাষার ক্ষেত্রে।  মানুষ একবার দু'পা এগোয় আর তিনপা পেছোয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বিভাজন এবং আগ্রাসনের মনোভাব থেকে মুক্ত হতে না পারার শৃঙ্খল তাকে পিছিয়ে দিতে বাধ্য করে।

বর্তমান বাংলাদেশের  টলোমলো রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিচারে ২০২৫ এর মাতৃভাষা দিবস নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না। চলে যাচ্ছি পেছনে, সেই ১৯৫২ এর ভাষিক স্বাধীনতা আন্দোলনের দিনগুলোতে।  

আমরা ৭১ এর যুদ্ধ দেখেছি, বরাক উপত্যকার ১৯ শে মে-র ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানি, ১৯৫২ এর ইতিহাস জানি।  বরাক উপত্যকায় দেখেছি উনিশ ও একুশের আত্মীকরণ। কারণ দুটি আন্দোলনের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একই আগ্রাসনের মনোবৃত্তি, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ।

১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো প্রথম বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিয়ে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" হিসেবে ঘোষণা করে।  প্রতিটি জাতি ও গোষ্ঠীর মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব দেওয়া ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র রক্ষায় এই গুরুত্বপূর্ণ ও মানবসভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে এই মহতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ইউনেস্কো পৃথিবীর ইতিহাসে অনবদ্য ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সাল, সারা বিশ্ব জুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়। সেখানে মাতৃভাষা স্বাধীনতার জন্যে এবং মুমুর্ষু ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে মানুষের চেতনাবৃদ্ধির বিষয়টিতে আলোকপাত করা হয়। ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষায় বিভিন্ন ভাষাশিক্ষা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র রক্ষার দিকটিকেও গুরুত্ব আরোপ করা হয়। 

উনিশ কিম্বা একুশ ভাষাদিবসের এই দুটো দিনের সাথে যে ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে তা হলো দেশভাগের ইতিহাস।  দেশভাগের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মারাত্মক ভুলের বোঝা বহন করে চলেছে আজও আমাদের দেশ ভারত ও আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশ।  "বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান " এই বাণী কেউ গ্রহণ করেনি, একে নস্যাৎ করে দিয়ে ১৯৪৭ এ ভারতের পুব ও পশ্চিমের ভূখণ্ড থেকে ১৬০০ কিলোমিটার অংশ কেটে দিয়ে স্বাধীনতার সূর্য উঠল।  দেশভাগ হলো পুব ও পশ্চিমের ভূখণ্ডে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে। কোন স্বার্থে তা হয়েছিল কেনই বা বিভাজনের নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হলো তা যথার্থই গবেষণার বিষয় আজও। সেই গবেষণা অব্যাহত থাকার কাজ জারি থাক আজও, এবং তা জরুরি বলেই মনে করি। 

দেশভাগের ফলস্বরূপ হাজার হাজার মানুষ ছিন্নভিন্ন ও ছিন্নমূল হলো। শরণার্থী শিবির, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ,  মৃত্যু,  নারীধর্ষণ ও নিখোঁজ হলো অজস্র মানুষ। হাহাকারে ভরে উঠল দেশ। তারপরও সমস্যা ক্রমশ আরও গভীর ও গুরুতর হয়ে উঠতে লাগল। যে কারণে দেশভাগ হলো তার সমস্যা আজও মেটেনি এবং কস্মিনকালেও মিটবে বলেও মনে হচ্ছে না এবং পরিস্থিতি আরও জটিল ও ঘোলাটে হয়ে উঠছে। আপাতসময় সেই দেশভাগই তার তর্জনি নির্দেশে পেছনের  পথটাই দেখাচ্ছে।

ভারতের পূর্বপ্রান্তের কিছু অংশ ও পশ্চিমপ্রান্তের কিছু অংশ নিয়ে ধর্মের নিরিখে গঠিত হলো নতুন দেশ "পাকিস্তান "। পুব পাকিস্তানের মুখের ভাষা বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের মুখের ভাষা উর্দু।  এতে কোনও সমস্যা ছিল না। যে যার মাতৃভাষায় কথা বলবে সেটাই তো স্বাভাবিক। তথ্যসূত্র বলে, পুব পাকিস্তানের লোকসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বেশি হওয়া সত্ত্বেও এবং জাতীয় অর্থনীতিতে পুব পাকিস্তানের দেয় পরিমাণ ভালো মাত্রায় হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানের হাতেই রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত হচ্ছিল এবং পুব পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবেও বঞ্চিত হচ্ছিল যদিও পুব পাকিস্তান থেকে পাটের রপ্তানি খুব ভালোভাবেই হতো। পুব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে একটা অন্তর্লীন বিরোধিতা ও অসন্তোষ ক্রমেই দানা বাঁধছিল। এই অসন্তোষ প্রবল হয়ে ওঠে  যখন পশ্চিম পাকিস্তান উর্দু ভাষাকে পুব পাকিস্তানের ওপর একমাত্র  সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়। পুব পাকিস্তানের মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে  শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্র জনতা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে, পুলিশ গুলি ছুঁড়তে শুরু করে, প্রথমেই গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ে রফিক। রফিকউদ্দিন আহমেদ। রফিক ছিলেন তখনকার ঢাকার জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। ইনি বাহান্নর প্রথম ভাষা শহিদ। একে একে শহিদ হন আবুল বরকত, শফিউর রহমান, আবদুস সালাম, আবদুল জব্বার।  মাতৃভাষা সুরক্ষায় এদের প্রাণ বলিদান ইতিহাসের বুকে গৌরবোজ্জ্বল স্থান করে নিয়েছে। 

অতি সম্প্রতি "আমি বাংলায় গান গাই, আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই" এই অনবদ্য গানটির স্রষ্টা শ্রদ্ধেয় প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের অমর একুশের প্রাকমুহূর্তে প্রয়াণ যেন অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল। এ যেন কিসের সংকেতবাহী। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা মাতৃভাষা সুরক্ষায় বুকের বল বাড়াতো। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন সত্যিই বাংলাভাষার সুরক্ষার দিকটি নিয়ে একটি  প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছে। বিভাজনের উগ্র মনোবৃত্তি  দ্রুত পরিস্থিতি বদলে দিচ্ছে। সুতরাং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের দিনে এই প্রশ্নচিহ্নগুলো অবশ্যই উঠে আসবে -

১. বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য কতটুকু সুরক্ষিত আজ বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে।

২. বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার সংখ্যা প্রায় ৭০০০ এর কিছুটা বেশি, তার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে মুমুর্ষু অবস্থায় রয়েছে, বাংলা ভাষা কি ধীরে ঐ দিকে এগোচ্ছে?

এইসব প্রশ্নের বিবেচনায় ২০২৫ এর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের জন্যে ইউনেস্কো বিশেষ বিষয় নিয়েছে - " Make language count for sustainable  development ". ইউনেস্কো ফেব্রুয়ারি ২০ ও ২১ শে হেডকোয়ার্টার প্যারিসে এই বিষয়ের আলোকে  আলোচনা চক্রের আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রজতজয়ন্তী পালন করছে। এখানে মুখের ভাষা সুরক্ষিত রাখা ও তার উন্নয়নের ওপর আলোকপাত করা হবে।

আমাদের বাংলায় এবং অমর উনিশের বরাক উপত্যকায় অমর একুশে হয়তো এবারও পালন করা হবে, কিন্তু সেই আবেগিক পথযাত্রা কতটুকু অব্যাহত থাকবে সেটাও একটা প্রশ্ন। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি সাপেক্ষে এবং সেই আনুষ্ঠানিকতা ছাড়িয়ে উঠছে যে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢাকা দিশাহীন পথ, সেখানে কি আলোর পথযাত্রী কেউ কি জেগে থাকবে?

 #বিজয়া দেব।



No comments:

Post a Comment