দ্রৌপদী’-এক বহুস্বরীয় কণ্ঠস্বর
‘দ্রৌপদী’ গল্পটির শুরুতেই পরিচয় পেয়ে যাই দ্রৌপদীর-‘নাম দ্রৌপদী মেঝেন, বয়স সাতাশ, স্বামী দুলন মাঝি(নিহত), নিবাস চেরাখান, থানা বাঁকড়াঝাড়, কাঁধে ক্ষতচিহ্ন(দোপদি গুলি খেয়েছিল, জীবিত বা মৃত সন্ধান দিতে পারলে এবং জীবিত হলে গ্রেপ্তারে সহায়তায় একশত টাকা...’কেন দ্রৌপদীকে গ্রেপ্তার হতে হবে?আদিবাসী মহিলাটি তকমাধারীর ভাষায়-‘মোস্ট নটোরিয়াস মেয়েছেলে। লং ওয়ান্টেড ইন মেনি...’কেন ‘নটোরিয়াস’? দুলন ও দ্রৌপদী মানে দোপদি মেঝেন ‘নিয়নডারথাল’ অন্ধকারে নিখোঁজ থাকে, আত্মগুপ্তিতে তাদের অসাধারণ দক্ষতা, লাশের মাঝখানে এরা নিহতের ভান করে পড়ে থাকতে জানে। উনিশশো একাত্তর সালে বিখ্যাত অপারেশন বাকুলিতে যখন তিনটি গ্রাম কর্ডন করে মেশিনগান করা হয় তখন দুলন ও দোপদি লাশের মাঝখানে নিহতের ভান করে পড়েছিল। প্রভাতে লাশ গুনতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সন্ধান না পেয়ে ক্যাপ্টেন অর্জন সিং এর ‘ব্লাড সুগার’ বেড়ে যায়। তকমাধারী সভ্যতার কাছে আদিবাসী সমাজ ও সংস্কৃতি, তাদের অনাদর, ক্ষুধা, ঘুরে দাঁড়ানোর সাহসী উদ্যম খুবই চিন্তার বিষয়। যে আদিবাসীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবী, যে মেকি সভ্যতাকে উপেক্ষায় বর্জন করেছিলেন, সেই আদিবাসী সমাজের দুলন-দোপদি ‘অপিসার’দের কাছে ‘এনিমি’ এবং এদের ধ্বংস করা খুবই জটিলতর প্রক্রিয়া। সুতরাং দুর্ভেদ্য ঝাড়খানি জঙ্গল তন্নতন্ন করে খোঁজে আর্মিরা আর চ্যাটাল পাথরে উপুড় হয়ে শুয়ে জল খাচ্ছিল যে সাঁওতাল যুবক তাকে গুলিবিদ্ধ করা হয়। ৩০৩নং এর আঘাতে ছিটকে পড়ে যেতে যেতে সে ভীষণ গর্জন করে ‘মা হো’। তারপর রক্তাক্ত হয়ে নিশ্চল হয়ে পড়ে। পরে বোঝা যায় সে-ই মোস্ট ওয়ান্টেড দুলন মাঝি-দোপদি মেঝেনের স্বামী। এরপর দোপদির খোঁজ। দোপদি পেটকাপড়ে ভাত নিয়ে যায় কমরেডদের জন্যে। মুসাই টুডুর বউ ভাত রেঁধে দেয়। কেউ দোপদি নামে ডাকে, দোপদি সাড়া দেয় না। এখানে তার নাম উপী মেঝেন। পঞ্চায়েত অফিসে সে দেখে এসেছে কাগজে তার নাম রয়েছে, যে তাকে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে দু’শ টাকা বখশিস দেওয়া হবে।রাস্তায় ধরা পড়ে যায় দোপদি। সেনানায়কের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। একঘন্টা জেরা করা হয়। তারপর সারারাত ধরে চলে লাগাতার ধর্ষণ। প্রায় অচেতন দ্রৌপদীর যখন চেতনা ফেরে তখন সে বুঝতে পারে তার যোনিদ্বারে চটচটে রক্ত, হচ্ছে রক্তস্রাব। কতজন তাকে ধর্ষণ করেছে...চার, পাঁচ, ছয়, সাত। সকালবেলায় হুকুম আসে বড় সাহেবের তাঁবু থেকে, দ্রৌপদীকে নিয়ে যাবার জন্যে। সান্ত্রী তাকে কাপড় পরাতে আসে কিন্তু দ্রৌপদী কাপড় পরে না। উলঙ্গ রক্তাক্ত দ্রৌপদী সেনাপ্রধানের সামনে এসে দাঁড়ায়। বিক্ষত তার স্তন, যোনিকেশে রক্ত, সেনানায়কের সামনে দাঁড়িয়ে দুর্বোধ্য হাসে। সেনানায়ক এই ভয়ানক মূর্তি দেখে সন্ত্রস্ত-কাপড় কোথায়? কাপড়?আর দ্রৌপদী যেভাবে সাথিদের জানান দেবার ‘কুলকুলি’ দিত তেমনি তীব্র তীক্ষ্ণ সুরে বলে- ‘ কাপড় কি হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু?’ তার রক্তমাখা থুতু সেনানায়কের সাদা বুশশার্টকে বেছে নেয়।‘দ্রৌপদী’ গল্পের স্রষ্টা মহাশ্বেতা দেবী আদিবাসী জীবন ও আরণ্যক জীবনস্রোতের সাথে ব্যক্তিগতভাবে জড়িত ছিলেন। কলকাতায় থেকেও মহানাগরিক জীবনস্রোত তার কাছে তেমন করে ধরা দেয়নি। প্রান্তিক জীবনচর্যা, তাদের বৈপ্লবিক চেতনার সাথে তার নৈকট্য দেশীয় মানুষের সার্বিক মুক্তির যেমন সন্ধান করেছে তেমনি মুখোশধারী মহানাগরিক জীবনের কৃত্রিমতাকে বর্জন করেছে। তাঁর পড়াশোনার ক্ষেত্রটিও ছিল স্বত্রন্ত্র ধারার। যা নিয়ে কাজ করতেন তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়পাঠে তাঁর আগ্রহ ছিল। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন-‘...আমি বহুদিন যাবতই পশিমবঙ্গের কথাসাহিত্য পড়ে উঠতে পারি না। কেননা আমার অত পড়া হয় না। যখন যেটুকু সুযোগ হয় পড়ি। হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আমাদের দেশে জনপ্রিয় লেখক। ওদের লেখা পড়েছি।...তবে আমি সবসময় যে ধরনের লেখা পড়ি তা হচ্ছে জরিপ, সরকারি আইন, পরিসংখ্যান ইত্যাদি। এগুলো নিয়ে কাজ করতে ভালবাসি। এগুলো নিয়েই অধিকাংশ সময় চলে যায়।’ (১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে মারুফ রায়হান কর্তৃক গৃহীত মহাশ্বেতা দেবীর সাক্ষাৎকার)‘দ্রৌপদী’ গল্পপাঠে তাই আমরা এক স্বত্রন্ত্র ঘরানার লেখিকাকে পেয়ে যাই। মনে হয়, লেখিকার লেখক হয়ে ওঠাই উদ্দেশ্য ছিল না, লেখাকে তিনি কাজে লাগিয়েছেন প্রান্তিক ভারতবর্ষের সমাজকর্মী হিসেবেই। দ্রৌপদী গল্পের ভাষ্যলিপিতে, প্রকরণকৌশলে সেই লেখিকাই পাঠকের কাছাকাছি চলে আসেন যিনি বাস্তবতা ও নান্দনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন একজন সমাজকর্মীর দৃষ্টিকোণ থেকেই।‘দ্রৌপদী’ গল্পের শেষার্ধে এসে চমকে উঠি যখন দেখি ধর্ষিতা দ্রৌপদী ধর্ষক সভ্যতার কাছে নগ্নরূপে ধরা দেয়। প্রখর সূর্যালোকে রক্তাক্ষরের অনুপুঙ্খে আঁকা হয় দ্রৌপদীর নগ্ন অবয়ব। ভাষা হয়ে ওঠে চাঁছাছোলা তলোয়ার-ধর্ষক সভ্যতার বুকে প্রতিটি অক্ষর যেন কেটে কেটে বসে সেনানায়কের সাদা বুশশার্টে ঘৃণার রক্তমাখা থুতু ছড়িয়ে দেয়। প্রতিপক্ষের ভীতির আঁচটুকু যেমন ছড়িয়ে পড়েছে গোটা গল্পে তেমনি শিহরিত হয়ে উঠি যখন দেখি দ্রৌপদী বলে-‘হেথা কেউ পুরুষ নাই যে লাজ করব, কাপড় মোরে পরাতে দিব না আর। কি করবি? লেঃ কাঁউটার কর লেঃ কাঁউটার কর...নারীমুক্তির আন্দোলনকে লেখিকা শোষণমুক্তির আন্দোলন থেকে কখনো আলাদা করে দেখেননি। শোষণমুক্ত সমাজে নারীপুরুষ নির্বিশেষে মানুষের সার্বিক মুক্তি সম্ভব তাই বিশ্বাস করেছেন। তবু একথা বলতেই হয় দোপদি মেঝেনের প্রতিবাদ, রুখে দাঁড়ানোর স্বাতন্ত্র নারীর প্রতিরোধশক্তিতে ভিন্নতর ভাষা জুগিয়েছে। দোপদি মেঝেন কি একাই দ্রৌপদী? এই সময়ে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বলতেই পারি নারীর ভূমিকা এ সমাজে যৌনতার নগ্ন স্তরেই আটকে আছে। এখানে সব নারীই দ্রৌপদী। দ্রৌপদীর এই প্রতিবাদ তাই আমাদের আমূল নাড়া দিয়ে যায়। প্রতিরোধী শক্তির পেছনে কোনও কৃত্রিমতা নয়, শুদ্ধ মানবিক স্বরটি শুনতে পাই আর নতুন করে ভাবতে বসি।
# বিজয়া দেব।
No comments:
Post a Comment